শরীয়তপুরে ভাঙনে বাঁধের ৫০ মিটার বিলীন, সরানো হচ্ছে বাজারের দোকান

প্রতিদিন সুরেশ্বর মাছের বাজারে দুই থেকে আড়াই কোটি টাকার মাছ কেনাবেচা হয়। বাজারটিকে কেন্দ্র করে পাঁচ শতাধিক পরিবারের জীবিকা নির্ভরশীল।

লিয়াকত প্রধানিয়া ৪০ বছর ধরে পদ্মা নদীতে মাছ ধরেন। প্রতিদিন সকালে সেই মাছ বিক্রি করেন শরীয়তপুরের নড়িয়ার সুরেশ্বর মাছের বাজারে। ভোরে যে ঘাটে নৌকা বাঁধতেন, গতকাল শুক্রবার সকালে এসে দেখেন, সেই ঘাট আর নেই। গত বৃহস্পতিবার রাতে ঘাটের পাশের পদ্মা নদীর তীররক্ষা বাঁধের একটি অংশ নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। এর পর থেকে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে মাছের বাজারের দোকানগুলো।

গতকাল সকালে নড়িয়ার ঘড়িষার ইউনিয়নের সুরেশ্বর মাছঘাট এলাকায় পদ্মার তীরে দাঁড়িয়ে ৫৫ বছর বয়সী লিয়াকত প্রধানিয়ার সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, বৃহস্পতিবার সকালেও মাছঘাটে নৌকা বেঁধেছিলেন। মাছের বাজারে মাছ বিক্রি করে আবার পদ্মায় গেছেন। তখন দেখেছেন, ঘাটের কাছে বাঁধের একটি অংশে ফাটল ধরেছে। কিন্তু রাতের মধ্যেই যে তা তলিয়ে বিলীন হয়ে যাবে, ভাবতেও পারেননি।

স্থানীয় মাছ ব্যবসায়ীরা বলেন, প্রতিদিন সুরেশ্বর মাছের বাজারে দুই থেকে আড়াই কোটি টাকার মাছ কেনাবেচা হয়। এক বিঘা জমির ওপর স্থাপিত বাজারটিকে কেন্দ্র করে জেলে, ক্রেতা-বিক্রেতা, ব্যবসায়ী ও শ্রমিকসহ পাঁচ শতাধিক পরিবারের জীবিকা নির্ভরশীল।

শরীয়তপুরের পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা যায়, গত মঙ্গলবার রাতে নড়িয়ার সুরেশ্বর মাছঘাট এলাকায় পদ্মা নদীর দক্ষিণ তীররক্ষা বাঁধের প্রায় ৩৫ মিটার অংশে ফাটল দেখা দেয়। এতে ঘাটপাড়ের মাছের বাজারের ৫০টি দোকান ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়ে। গত বুধবার দুপুরে বাঁধের পাশে থাকা পাঁচটি দোকান সরিয়ে নেওয়া হয়। একই সঙ্গে ভাঙন ঠেকাতে বালুভর্তি জিও ব্যাগও ফেলা হয়। এর মধ্যে বৃহস্পতিবার রাতে বাঁধের ৫০ মিটার অংশ নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। পানি কমতে থাকায় নদীর স্রোতের তোড়ে তলদেশের মাটি সরে যাওয়ার কারণে এই ভাঙন দেখা দিয়েছে। তবে বাজারটির আশপাশে কোনো বসতবাড়ি নেই।

স্থানীয় মাছ ব্যবসায়ীরা বলেন, প্রতিদিন সুরেশ্বর মাছের বাজারে দুই থেকে আড়াই কোটি টাকার মাছ কেনাবেচা হয়।

ঘড়িষার ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) প্যানেল চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম দেওয়ান প্রথম আলোকে বলেন, পদ্মা নদীর তীরে ১৯৫৬ সালে মাছের বাজারটি স্থাপিত হয়। দুই শতাধিক জেলে প্রতিদিন পদ্মা থেকে মাছ শিকার করে ৭০ বছরের পুরোনো এই মাছের বাজারে বিক্রি করেন। পদ্মার ভাঙনের কবলে পড়া বাজারটি রক্ষার জন্য সরকারি জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

সরিয়ে নেওয়া হয়েছে ২০টি দোকান

পদ্মা নদীর টাটকা মাছের জন্য পরিচিত সুরেশ্বর মাছের বাজার। বাজারটিতে ৪০টি মাছের আড়ত, পাঁচটি বরফ বিক্রির দোকান এবং মাছ ও জেলেদের প্রয়োজনীয় বিভিন্ন সামগ্রীর আরও পাঁচটি দোকান ছিল। প্রতিদিন ভোর থেকে জেলেরা নৌকা নিয়ে মাছঘাটে আসেন। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত জেলে, ক্রেতা-বিক্রেতা ও আড়তশ্রমিকের পদচারণে মুখর থাকত বাজারটি। ভাঙনের কবলে গত বুধবার ও বৃহস্পতিবার এই দুই দিনে মাছের বাজারের ২০টি দোকান সরিয়ে নিতে হয়েছে।

এই মাছের বাজারে ২০ বছর ধরে মাছ কেনাবেচা করেন দ্বীন ইসলাম। তাঁর দোকানটিও নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। গতকাল সকালে নদীর তীরে খোলা আকাশের নিচে মাছ বিক্রি করছিলেন তিনি।

দ্বীন ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, নদীর তীররক্ষা বাঁধের কারণে পাঁচ বছর এখানে নদীভাঙন বন্ধ ছিল। কিন্তু বৃহস্পতিবার রাতে হঠাৎ দেখেন, বাঁধের একটি অংশ নদীতে তলিয়ে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে তাঁর দোকানটিও স্রোতের তোড়ে চলে গেছে। খুব আতঙ্কের মধ্যে আছেন, কখন আবার পুরো বাজার নদীতে বিলীন হয়ে যায়।

নদীতে পানি কমতে থাকায় নদীর তলদেশের মাটি সরে যাচ্ছে। জরুরি ভিত্তিতে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করছেন। শুষ্ক মৌসুমে ভেঙে যাওয়া ওই অংশ স্থায়ীভাবে সংস্কার করা হবে।
মিলটন হোসেন, নির্বাহী প্রকৌশলী, শরীয়তপুর পাউবো

পাউবো সূত্রে জানা যায়, ২০১৮ সালে সুরেশ্বর মাছের বাজার এলাকা পদ্মার ভাঙনের মুখে পড়ে। তখন জাজিরার বিলাসপুরের শফি কাজীর মোড় থেকে নড়িয়ার সুরেশ্বর মাছঘাট পর্যন্ত ১০ দশমিক ২ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ কাজ শুরু হয়। ২০২৩ সালে বাঁধটির নির্মাণকাজ শেষ হয়। এতে ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ৪০৩ কোটি টাকা। জাজিরা ও নড়িয়া উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের ভাঙন ঠেকাতে বাঁধটি নির্মাণ করা হয়।

বাঁধটির নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার তিন বছরের মধ্যেই সেখানে ভাঙন দেখা দিল। এতে আতঙ্কের মধ্যে পড়েছেন স্থানীয় লোকজন। সুরেশ্বর এলাকার বাসিন্দা শফিকুল ইসলাম বলেন, তিনি এ পর্যন্ত আটবার নদীভাঙনের শিকার হয়েছেন। ২০১৭ সালে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বসতবাড়ি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে মাছের বাজারের কাছে দোকান খুলেছিলেন। এখন সেই দোকানটিও সরিয়ে নিতে হচ্ছে। এখন কোথায় যাবেন, সেটাই বুঝতে পারছেন না।

নদীর গভীরতা বেড়েছে

পাউবোর প্রকৌশলীরা জানান, এবার বর্ষা মৌসুমের শুরুতে সুরেশ্বর এলাকায় পদ্মার বিভিন্ন অংশে নদীর গভীরতা বাড়তে থাকে। নদীর তলদেশের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে পাউবো নিয়মিত সমীক্ষা চালায়। গত ২৫ সেপ্টেম্বরের সমীক্ষায় দেখা যায়, বাঁধের কাছাকাছি নদীর তীরবর্তী অংশে গভীরতা ১০ থেকে ২২ মিটার। অথচ ওই এলাকায় স্বাভাবিক গভীরতা থাকার কথা ৩ থেকে ৭ মিটার। বাঁধে ফাটল দেখা দেওয়ার পর গত বুধবার ওই এলাকায় আবার সমীক্ষা চালানো হয়। তখন নদীর গভীরতা ১৮ থেকে ৩০ মিটার পর্যন্ত পাওয়া যায়। নদীর এই অস্বাভাবিক গভীরতার কারণে ভাঙনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

শরীয়তপুর পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মিলটন হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, নদীতে পানি কমতে থাকায় নদীর তলদেশের মাটি সরে যাচ্ছে। জরুরি ভিত্তিতে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করছেন। শুষ্ক মৌসুমে ভেঙে যাওয়া ওই অংশ স্থায়ীভাবে সংস্কার করা হবে।