জমি নিয়ে বিরোধে যাতায়াতের পথে বেড়া, দুই সপ্তাহ অবরুদ্ধ একটি পরিবার
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে জমি নিয়ে বিরোধের জেরে একটি পরিবারের বাড়ির যাতায়াতের পথ বেড়া দিয়ে বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় পরিবারটির সদস্যরা দুই সপ্তাহ ধরে অবরুদ্ধ হয়ে আছেন। তাঁদের শৌচাগার ও নলকূপ ওই বেড়ার বাইরে আছে।
ঘটনাটি উপজেলার হরিপুর ইউনিয়নের কর্মকারপাড়ার। ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, প্রতিবেশী রফিক মিয়ার পরিবারের লোকজন ৯ আগস্ট তাঁদের বাড়ির দরজার সামনে ও উঠানের পথের ওপর বাঁশের বেড়া দেন। এতে তাঁদের চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। শৌচাগার ভেঙে ফেলা হয়েছে এবং নলকূপটি টিন ও ময়লা দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কর্মকারপাড়ার বাসিন্দা মন্টু কর্মকার ২০০৩ সালে তাঁর চাচাতো ভাই উত্তম রায়ের কাছ থেকে সাবেক ১৮৯৭ দাগের ৬ দশমিক ৩৩ শতাংশ জমি বায়না দলিলমূলে কেনেন। ২০১৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর দলিল লেখক ও সাবেক ইউপি সদস্য আশিকুর রহমানের মাধ্যমে জমি কেনার দলিল সম্পাদন করা হয়। এতে উত্তম রায় স্বাক্ষর করেন। মন্টুর দাবি, তিনি জমির দাম বাবদ ৩ লাখ ৫৬ হাজার টাকা পরিশোধ করেন। তবে সাবরেজিস্ট্রারের কার্যালয়ে জমা দেওয়ার আগেই উত্তম চলে যাওয়ায় দলিলটি নিবন্ধন হয়নি।
পরে ২০১৭ সালে একই জমি সৌদি আরবপ্রবাসী রফিক মিয়ার কাছে বিক্রি করেন উত্তম। বিষয়টি জানার পর মন্টু গত এক বছরের মধ্যে দুই দফায় আদালতে মামলা করেন। এর পর থেকেই দুই পক্ষের বিরোধ আরও বেড়ে যায়।
এই জায়গা প্রথমে মন্টু কিনছেন জানিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা তাউস মিয়া বলেন, পরে উত্তম একই জায়গা রফিকের কাছে বিক্রি করেছেন। আরেক বাসিন্দা সুজন পাঠান বলেন, বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার সালিস হয়েছে। তবে কোনো পক্ষই ছাড় দিতে রাজি না হওয়ায় সমাধান হয়নি।
মন্টুর পরিবারের সদস্যরা জানান, ৯ আগস্ট দিনের বেলায় তাঁদের ঘরের দরজায় তালা লাগিয়ে বের করে দেওয়া হয়। পরে পুলিশের সহায়তায় তাঁরা ঘরে ফিরতে পারলেও বেড়া সরানো হয়নি। ঘরের দরজার সামনে প্রায় ২০ ফুট এবং উঠান থেকে বের হওয়ার পথে প্রায় ২৫ ফুট দীর্ঘ বাঁশের বেড়া দেওয়া হয়েছে।
মন্টুর পরিবারের সদস্য সুবর্ণা কর্মকার বলেন, দিনের বেলায় শৌচাগার ব্যবহারের কোনো উপায় নেই। বাধ্য হয়ে রাতে পাশের পুকুরপাড়ে যেতে হচ্ছে। খাবার পানির জন্যও প্রতিদিন কলস নিয়ে প্রতিবেশীদের বাড়িতে যেতে হচ্ছে।
মন্টু কর্মকার প্রথম আলোকে বলেন, ‘দলিলে উত্তম স্বাক্ষর করলেও সেটি নিবন্ধন হয়নি। অনিবন্ধিত দলিলের ভিত্তিতেই আমি আদালতে মামলা করেছি। এখন রফিক মিয়ার লোকজন বাড়ির চারপাশে বেড়া দিয়েছে। মামলা ও বাড়াবাড়ি করলে হত্যার হুমকিও দেওয়া হয়েছে। পরিবার নিয়ে আমি নিরাপত্তাহীনতায় আছি।’
তবে রফিক মিয়ার স্ত্রী জানাহারা বেগম অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তাঁরা নিজেদের জায়গায় বেড়া দিয়েছেন। মন্টুর জায়গায় বেড়া দেওয়ার অভিযোগ সত্য নয়। হামলা-মামলা করলে হত্যার হুমকি দেওয়ার অভিযোগও তিনি অস্বীকার করেন।
দলিলে উত্তম স্বাক্ষর করলেও সেটি নিবন্ধন হয়নি। অনিবন্ধিত দলিলের ভিত্তিতেই আমি আদালতে মামলা করেছি। এখন রফিক মিয়ার লোকজন বাড়ির চারপাশে বেড়া দিয়েছে। মামলা ও বাড়াবাড়ি করলে হত্যার হুমকিও দেওয়া হয়েছে। পরিবার নিয়ে আমি নিরাপত্তাহীনতায় আছি।মন্টু কর্মকার, ভুক্তভোগী
জমির আগের মালিক উত্তম রায় বলেন, মন্টু জালিয়াতি করে তাঁর কাছ থেকে দলিলে স্বাক্ষর নিয়েছিলেন। এ কারণে তিনি ওই জমি রফিকের কাছে বিক্রি করেছেন। মন্টুর সব অভিযোগ মিথ্যা ও বানোয়াট বলেও দাবি করেন তিনি।
হরিপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফারুক মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, উত্তম রায়ের কাছ থেকে মন্টু কর্মকার জায়গা কিনেছেন বলে তিনি শুনেছেন। মন্টুর কাছে দলিল বা বায়নাপত্রও রয়েছে। পরে একই জায়গা রফিক কিনেছেন বলেও শুনেছেন। উভয় পক্ষকে ডেকে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করবেন।
নাসিরনগর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) ও হরিপুর ইউনিয়নের বিট কর্মকর্তা মনির হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, উত্তমের কাছ থেকে জায়গা কেনা হলেও দলিলটি নিবন্ধন হয়নি। মন্টুর লিখিত অভিযোগের পর পুলিশ তাঁদের বাড়িতে গিয়ে বাঁশ ও টিনের বেড়ার কিছু অংশ সরিয়ে দিয়েছে। উভয় পক্ষকে থানায় বসে বিরোধ নিষ্পত্তির প্রস্তাব দেওয়া হলেও কেউ আসেনি।