মিনি পাম্পে জ্বালানি তেলের অবৈধ ব্যবসা

গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার বিভিন্ন সড়কের পাশে জ্বালানি তেল বিক্রির এ ধরনের বেশ কিছু দোকান গড়ে উঠেছে।

দোকানের ভেতর তেল সরবরাহের ডিসপেন্সার মেশিন। গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার সনমানিয়া ইউনিয়নের আড়াল বাজারে
ছবি: প্রথম আলো

ছোট ছোট দোকানে ফিলিং স্টেশনের মতো ডিসপেন্সার মেশিন বসিয়ে বিক্রি হচ্ছে ডিজেল, পেট্রল, অকটেন। অথচ এগুলোর নেই কোনো ডিলারশিপ কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন। জ্বালানি তেল বিক্রির এ ব্যবস্থা পরিচিত ‘মিনি পাম্প’ নামে।

গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার বিভিন্ন সড়কের পাশে জ্বালানি তেল বিক্রির এ ধরনের বেশ কিছু দোকান গড়ে উঠেছে। আরও কয়েকটি দোকান চালুর অপেক্ষায়। এসব পাম্পে ভেজাল তেল সরবরাহের যেমন আশঙ্কা আছে, তেমনি আছে নিরাপত্তাঝুঁকিও। নিরাপত্তার কারণে ২০১৫ সাল থেকে খোলাবাজারে জ্বালানি তেল বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা আছে।

আমার কাছে কাগজপত্র এই মুহূর্তে নাই। অন্য একজনের মাধ্যমে কাগজপত্র করিয়েছিলাম
মোতাহার হোসেন, উদ্যোক্তা, জমজম ট্রেডার্স

সরেজমিনে তরগাঁও ইউনিয়নের করিমের মিল এলাকায়, সনমানিয়া ইউনিয়নের গনি মার্কেটে, গিয়াসপুর থেকে সালধৈ এলাকায়, টোক ইউনিয়নের বীরউজুলী বাজারে একটি করে মিনি পাম্প দেখা গেছে। আরও দুটি জায়গায় এ ধরনের পাম্প তৈরির কাজ চলছে। এসব পাম্পে কোনো সাইনবোর্ড নেই। সড়কের পাশে ছোট্ট দোকানের ভেতরে দুটি বা তিনটি ডিসপেন্সার মেশিন বসিয়ে ব্যবসা চালানো হচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কাপাসিয়ায় এ ধরনের মিনি পাম্প চলছে চার বছরের বেশি সময় ধরে। স্থানীয় প্রশাসন, বিস্ফোরক পরিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) ও পরিবেশ অধিদপ্তরের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা প্রথম আলোকে জানিয়েছেন, এ ধরনের ব্যবস্থাপনায় তেল বিক্রির কোনো অনুমতি দেওয়া হয়নি।

পরিবেশ অধিদপ্তরের গাজীপুর কার্যালয়ের উপপরিচালক নয়ন মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, মিনি পাম্প স্থাপনে কাউকে অনুমতি দেওয়া হয়নি। এসব পাম্পে ছাড়পত্র দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই বলে জানালেন ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স ঢাকা বিভাগের উপপরিচালক দিনমণি শর্মা।

কাপাসিয়া পেট্রল পাম্প মালিক সমিতির সভাপতি মো. ইকবাল প্রথম আলোকে বলেন, কোনো অনুমতি না নিয়ে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা এসব মিনি পেট্রলপাম্প বন্ধ করা জরুরি। তারা ভেজাল তেল বিক্রি করে গ্রাহকদের সঙ্গে প্রতারণা করছে। তা ছাড়া এ প্রক্রিয়ায় তেল বিক্রির কারণে অনেক টাকা বিনিয়োগ করে প্রতিষ্ঠিত পেট্রলপাম্পগুলো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

তবে মিনি পাম্প ব্যবসায়ীরা দাবি করছেন, তাঁরা নিয়ম মেনে ব্যবসা করছেন। সব অনুমোদন আছে। ডিলারদের কাছ থেকে তেল এনে মজুত করে বিক্রি করেন। জমজম ট্রেডার্স নামের একটি মিনি পাম্পের উদ্যোক্তা মোতাহার হোসেন বলেন, ‘আমার কাছে কাগজপত্র এই মুহূর্তে নাই। অন্য একজনের মাধ্যমে কাগজপত্র করিয়েছিলাম। ওই ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছি না। কাগজ নরসিংদী জেলা পেট্রল পাম্প মালিক সমিতির কাছে জমা দিয়েছি।’

সনমানিয়া ইউনিয়নের আড়াল বাজারে মিনি পাম্পের মালিক জহিরুল ইসলাম বলেন, কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়েই পাম্প বসিয়েছেন তিনি। পরিবেশ অধিদপ্তরের ২০২১ সালে মেয়াদোত্তীর্ণ একটি সাদা–কালো ফটোকপি করা ছাড়পত্র দেখান জহিরুল। বিস্ফোরক পরিদপ্তরের একটি স্বাক্ষরবিহীন অনুমতিপত্রও দেখান তিনি। তিনি বলেন, ‘কাগজপত্র আপনার হাতে দেওয়া যাবে না। আমার ক্ষতি করলে করতে পারেন।’

মিনি পাম্পের মাধ্যমে কাপাসিয়া এলাকায় অবৈধভাবে তেল বিক্রির বিষয়ে গত বছর বিপিসির অঙ্গপ্রতিষ্ঠান মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেড জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিতভাবে জানিয়েছিল। একই সময়ে দুটি মিনি পেট্রলপাম্পকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছিল বিস্ফোরক পরিদপ্তর।

২০১৫ সাল থেকে খোলা দোকানে জ্বালানি তেল বিক্রি বন্ধ করা হয়েছে বলে জানিয়ে পদ্মা অয়েলের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা (বিপণন) মো. সালাহ উদ্দিন বলেন, অনুমোদিত পাম্পগুলোতে মাপে তেল কম দেওয়া বা বিভিন্ন অনিয়মের কারণে জরিমানা করা যায়। কিন্তু মিনি পাম্প নিজেরা সরাসরি ডিলার না হওয়ায় সেখানে এসব অনিয়ম দেখার সুযোগ থাকে না। তবে প্রশাসন চাইলেই অভিযান পরিচালনা করতে পারে।

কাপাসিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এ কে এম গোলাম মোর্শেদ খান প্রথম আলোকে বলেন, এসব প্রতিষ্ঠান অবৈধভাবে চলছে। এগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।