সখিনা বেগম তাঁর অন্য দুই মেয়ের মতোই শাহিনুরকে পরম মমতায় আগলে রেখেছেন। শাহিনুরের চাচা শফিকুল ইসলাম পেশায় রিকশাচালক। তাঁর আয় দিয়ে পুরো সংসার চলছে। ছয়-সাত মাস বয়স পর্যন্ত শাহিনুরকে দেখে কিছু বুঝতে পারেনি তার পরিবার। তবে নয় মাস বয়সে শাহিনুরের আচরণ দেখে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধিতার বিষয়টি বুঝতে পারেন তাঁরা। এরপর আরেকটু বয়স বাড়ার পর বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়।

সখিনা বেগম বলেন, ‘ঝামেলা এড়াতেই হয়তো তার বাবা রফিকুল ইসলাম মেয়ে ছেড়ে গেছেন। কিন্তু আমি ছাড়তে পারিনি।’

চোখে দেখতে না পারায় শাহিনুর ছোটবেলায় একা চলতে পারত না। একটু বড় হওয়ার পর কোনোকিছুর সাহায্য নিয়ে ধরে ধরে ঘরের এক পাশ থেকে অন্য পাশে যাওয়ায় অভ্যস্ত হয়। তবে আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় শাহিনুরের উন্নত চিকিৎসা করতে পারছিল না পরিবার। পরে সমাজসেবা কর্মকর্তার মাধ্যমে শাহিনুরের জন্য প্রতিবন্ধী ভাতার ব্যবস্থা করা হয়। কয়েক বছর ধরে ভাতার টাকা জমা করেন শাহিনুরের চাচা-চাচি। কিছু টাকা জমার পর গত বছরের নভেম্বরে শাহিনুরকে নিয়ে চিকিৎসকের কাছে যান তাঁরা। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসক শাহিনুরের চোখে কৃত্রিম লেন্স প্রতিস্থাপনের পরামর্শ দেন।

শাহিনুরের জন্য হাত বাড়িয়ে দেওয়া সাদ্দাম হোসেন শ্রীপুরের নগরহাওলা গ্রামের বাসিন্দা। সেখানে তাঁর রেস্টুরেন্টের ব্যবসা আছে। এর আগেও তিনি ১১ জন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষের চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছেন।

তবে শাহিনুরের পরিবারের কাছে তখন পর্যাপ্ত টাকা ছিল না। এ অবস্থায় শ্রীপুর উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের ট্রেড ইনস্ট্রাক্টর মো. আমিনুল ইসলাম শাহিনুরের চিকিৎসার জন্য ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে বিত্তবানদের সহযোগিতা চান। ওই পোস্ট দেখে সাদ্দাম হোসেন শাহিনুরের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।

পরে সাদ্দাম হোসেনের সহায়তায় রাজধানী ঢাকার ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতালে শাহিনুরের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। ওই সময় এক চোখে একটি লেন্স প্রতিস্থাপন করা হয়। এতে তার দৃষ্টিশক্তি কিছুটা ফিরে আসে। কয়েক মাস অপেক্ষার পর চলতি বছরের জুনে শাহিনুরের আরেক চোখে সফল অস্ত্রোপচার হয়। এর পর থেকে সে সবকিছু পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে।

সখিনা বেগম বলেন, সবশেষ অপারেশনের অস্ত্রোপচারের পর শাহিনুর অবাক হয়ে চোখ খুলেছে। অস্ত্রোপচারের ধকলের পরও তাকে খুব খুশি লাগছিল। চোখ খোলার সঙ্গে সঙ্গে সে চারদিকে তাকাচ্ছিল। শাহিনুর চোখ খুলেই বারবার বলছিল, ‘চাচি, আমি সব দেখতে পাইতাছি। আমার অনেক ভালো লাগতাছে।’

আজ বৃহস্পতিবার সকালে শাহিনুরের সঙ্গে এই প্রতিবেদকের কথা হয়। সে বলে, এটা তার জন্য নতুন এক জীবন। সে এখন সবকিছু ভালো দেখতে পায়। অন্য সবার মতোই সব কাজ এখন করতে পারে। অস্ত্রোপচারের পর চিকিৎসক তাকে কিছুদিন চশমা পরে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। কয়েক দিনের মধ্যে আবারও চিকিৎসকের সঙ্গে তার দেখা করার কথা আছে। নতুন করে সবকিছু দেখতে পাওয়ার পেছনে সাদ্দাম হোসেনের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে শাহিনুর।

মো. আমিনুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, শাহিনুর জন্ম থেকেই চোখে দেখতে পাচ্ছিল না। তার পরিবার ধরেই নিয়েছিল, সে আর কখনো দেখতে পাবে না। তবে শাহিনুরের পাশে একজন হৃদয়বান মানুষ দাঁড়িয়েছেন। দৃষ্টি ফিরে পেয়ে শাহিনুর এক নতুন জীবন পেয়েছে। এ ঘটনায় ‘মানুষ মানুষের জন্য’ কথাটি আরও একবার প্রতিষ্ঠিত হলো।

শাহিনুরের জন্য হাত বাড়িয়ে দেওয়া সাদ্দাম হোসেন শ্রীপুরের নগরহাওলা গ্রামের বাসিন্দা। সেখানে তাঁর রেস্টুরেন্টের ব্যবসা আছে। এর আগেও তিনি ১১ জন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষের চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছেন। সাদ্দাম হোসেন বলেন, ‘দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষ খুব কষ্টে জীবন যাপন করেন। তাঁদের দুর্বিষহ জীবনযাপনের বিষয়টি বহু আগে থেকেই আমাকে নাড়া দেয়। আমি দেখেছি, অনেকের অর্থনৈতিক সচ্ছলতা থাকলেও একটা অপূর্ণতা থেকেই যায়। তাই চেষ্টা করি কোনোভাবে তাঁদের দৃষ্টি ফিরিয়ে আনা যায় কি না।’

সাদ্দাম বলেন, তিনি সাধারণ ব্যবসায়ী। কোনো স্বার্থের জন্য নয়, মানুষের কষ্টের জীবনকে সহজ করার জন্য তিনি নিজের দৈনন্দিন আয় থেকে চিকিৎসা করিয়েছেন। তিনি কয়েক দিনের মধ্যেই শাহিনুরকে তার ইচ্ছা অনুযায়ী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি করিয়ে দেবেন। শাহিনুরের পড়াশোনার খরচ চালিয়ে যাওয়ার আশ্বাসও দেন তিনি।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন