নাটোরের সিংড়া উপজেলার লালোর ইউনিয়নের বড় বারইহাটি বটতলা এলাকায় গম ও শর্ষের দানায় বিষ মিশিয়ে পাখি শিকারের ঘটনা ঘটেছে। সম্প্রতি নাটোর সদর ও বড়াইগ্রাম উপজেলাতেও একই ঘটনা ঘটেছে। এভাবে পাখি নিধনের কারণে এলাকার জীববৈচিত্র্য নষ্ট হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে প্রথম আলো কথা বলেছে পরিবেশবাদী সংগঠন চলনবিল জীববৈচিত্র্য রক্ষা কমিটির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলামের সঙ্গে।
প্রশ্ন :
প্রথম আলো: বড় বারইহাটি বটতলা এলাকায় গম ও শর্ষের দানায় বিষ মিশিয়ে পাখি শিকারের ঘটনাটি আপনি নিশ্চয় জানেন। এ ধরনের ঘটনায় পরিবেশের ওপর কেমন প্রভাব পড়বে?
সাইফুল ইসলাম: নিশ্চয়। এ ধরনের ঘটনা জীববৈচিত্র্যের জন্য বড় রকমের হুমকি। এই ঘটনায় এ পর্যন্ত ১২টি ঘুঘু ও ১৫টি কবুতরের মৃত্যু হয়েছে। খাদ্যের সংকট ও আবাসন সমস্যার কারণে এমনিতেই পাখি প্রকৃতি থেকে বিলুপ্ত হতে বসেছে। এখন যদি বিষ দিয়ে এগুলো মারা হয়, তাহলে খুব অল্প সময়ের মধ্যে আমরা আর ঘুঘু ও কবুতর দেখতে পাব না। তারা প্রকৃতির ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ খেয়ে কৃষকের উপকার করে। তাদের অবর্তমানে কৃষকেরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
প্রশ্ন :
প্রথম আলো: বারইহাটিতে কি শস্যের বীজ রক্ষার জন্য বিষ দেওয়া হয়েছিল, নাকি পাখি শিকারের জন্য?
সাইফুল ইসলাম: আমরা খোঁজ নিয়ে জেনেছি, অভিযুক্ত তৈবুর রহমান পাখি শিকার করে মাংস খাওয়ার জন্য এ কাজ করেছেন। কারণ, আমরা ঘটনা জানার পরপরই তাঁর বাড়িতে গিয়ে ঘুঘু ও কবুতরের কাটা মাংস উদ্ধার করেছি। পরিবারের নারী সদস্যরা এসব মাংস রান্নার জন্য প্রস্তুত করছিলেন।
প্রশ্ন :
প্রথম আলো: এ ঘটনা কি আপনারা প্রথমে জানতে পেরেছিলেন, না প্রশাসন?
সাইফুল ইসলাম: প্রায় প্রতিটি গ্রামে আমাদের সংগঠনের সদস্য আছেন। তাঁদের মাধ্যমে আমরাই প্রথমে ঘটনাটির খবর পাই। ঘটনাস্থলে গিয়ে হাতেনাতে মৃত পাখি উদ্ধারের পর আমরা স্থানীয় প্রশাসনকে জানিয়েছিলাম। একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তাৎক্ষণিক সেখানে গিয়েছিলেন।
প্রশ্ন :
প্রথম আলো: জীববৈচিত্র্য রক্ষার জন্য স্থানীয় প্রশাসনের মনোভাব কেমন মনে করেন?
সাইফুল ইসলাম: অন্য জায়গায় প্রশাসন কী মনোভাব দেখায়, তা বলতে পারব না। তবে সিংড়ার প্রশাসন এ ব্যাপারে আন্তরিক। আমরা যখনই তাদের পরিবেশ বিনষ্টকারী ব্যক্তিদের ব্যাপারে খবর দিই, তখনই তারা ঘটনাস্থলে যাওয়ার চেষ্টা করে।
প্রশ্ন :
প্রথম আলো: বারইহাটির ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তিকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন। এই দণ্ড পর্যাপ্ত বলে মনে করেন?
সাইফুল ইসলাম: প্রকৃতির ক্ষতির তুলনায় এই দণ্ড পর্যাপ্ত নয়। অর্থদণ্ডের পাশাপাশি কারাদণ্ড দেওয়া হলে ভালো হতো। তবে বারইহাটিতে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে জরিমানার পাশাপাশি কিছু শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছিল। যেমন পাখিদের রক্ষার জন্য গমের জমিটি ঢেকে রাখার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। এটা না করার কারণে আবার পাখি মারা গেলে লাখ টাকা জরিমানা করার কথা বলা হয়েছে। এগুলো ইতিবাচক ছিল।
প্রশ্ন :
প্রথম আলো: ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশনা মানা হয়েছিল কি না, সে ব্যাপারে পরবর্তী সময় আপনার সংগঠনের পক্ষ থেকে খোঁজ নিয়েছেন কি?
সাইফুল ইসলাম: হ্যাঁ, খোঁজ নেওয়া হয়েছে। স্থানীয় উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা সারোয়ার জাহান ও ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সদস্য মহিউদ্দিন মনির মাধ্যমে আমি জেনেছি, অভিযুক্ত ব্যক্তি সকালে জমিতে একজন প্রহরী বসিয়েছিলেন। দুপুরে তিনি পুরো জমি জাল দিয়ে ঢেকে দিয়েছেন।
প্রশ্ন :
প্রথম আলো: জীববৈচিত্র্য রক্ষার জন্য কার কী করা দরকার বলে আপনি মনে করেন?
সাইফুল ইসলাম: এটা অনেক বড় ব্যাপার। তবু এককথায় বলা যায়, সবাইকে যার যার জায়গা থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। বারইহাটির ঘটনা থেকে বলা যায়, কৃষি কর্মকর্তারা কৃষকদের বিষ ব্যবহারের ব্যাপারে আগাম সতর্কতামূলক পরামর্শ দিতে পারেন। পশু ও প্রাণিসম্পদ বিভাগ থেকে গ্রামগঞ্জে সচেতনতামূলক কর্মসূচি নিতে পারেন। সর্বোপরি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও চৌকিদারেরাও এ ব্যাপারে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে পারেন।
প্রশ্ন :
প্রথম আলো: এ ব্যাপারে বেসরকারি সংগঠনের ভূমিকা কী হতে পারে?
সাইফুল ইসলাম: চলনবিল জীববৈচিত্র্য রক্ষা কমিটি একটি বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। আমরা এলাকার সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে পরিবেশ রক্ষার ব্যাপারে সচেতন করি এবং তাদের কাজে লাগাই। অন্যদেরও এভাবে এগিয়ে আসা উচিত। পাশাপাশি সরকারের এসব বেসরকারি সংগঠনগুলোর পৃষ্ঠপোষকতা করা দরকার।