বেঁচে থাকা সহোদর পড়ালেন ৪ ভাইয়ের জানাজা, মৃত্যুর এক সপ্তাহ পর জানানো হলো মাকে
বিদেশে থাকা চার ছেলের একসঙ্গে মৃত্যু হয়েছে এক সপ্তাহ আগে। তবে সেই খবর জানতেন না মা। ছেলেদের কফিনবন্দী মরদেহ বাড়িতে আনার পর জানানো হয় মাকে। কক্ষ থেকে বেরিয়ে এসে ছেলেদের কফিন দেখে কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছিলেন তিনি। আহাজারি করতে করতে বারবার জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়ছিলেন মাটিতে।
আজ বুধবার সকালে এই দৃশ্য দেখা যায় চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার লালানগর বন্ধরাজপাড়ায়। ১৩ মে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ওমানে গাড়ির ভেতর থেকে উদ্ধার হয় এই পাড়ারই বাসিন্দা চার ভাইয়ের মরদেহ। আজ সকাল সাতটায় চারজনের মরদেহ বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। এর আগে গতকাল রাত নয়টার দিকে ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছে কফিনবন্দী মরদেহগুলো। মারা যাওয়া চার ভাই হলেন শাহিদুল ইসলাম, সিরাজুল ইসলাম, শহিদুল ইসলাম ও রাশেদুল ইসলাম।
ঘরে কারও কথা বলার মতো অবস্থাই নেই। একসঙ্গে চার ভাইয়ের মৃত্যুর ঘটনা ঘটল। তাঁদের মাকে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো ভাষাও কেউ খুঁজে পাচ্ছে না।
সকালে রাঙ্গুনিয়ার বাড়িটিতে গিয়ে চারপাশে কয়েক শ মানুষের ভিড় দেখা যায়। কেউ কান্না করছেন। কেউ আবার মারা যাওয়া চারজনের স্মৃতিচারণায় ব্যস্ত। ঘরের ভেতরে গিয়ে আহাজারি করতে দেখা যায় মারা যাওয়া চারজনের মা খদিজা বেগমকে। সেখানে আহাজারি করছিলেন নিহত রাশেদুলের স্ত্রী কুলসুমা আক্তার ও সাহেদের স্ত্রী শান্তা আকতারও। তাঁরা দুজনও আহাজারি করতে করতে বারবার জ্ঞান হারাচ্ছিলেন।
সাফিয়া বেগম নামের এলাকার এক নারী বলেন, ‘ঘরে কারও কথা বলার মতো অবস্থাই নেই। একসঙ্গে চার ভাইয়ের মৃত্যুর ঘটনা ঘটল। তাঁদের মাকে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো ভাষাও কেউ খুঁজে পাচ্ছে না।’
স্বজনেরা জানান, ১৩ মে চার ভাইয়ের মৃত্যু হলেও তাঁদের মাকে এত দিন জানানো হয়নি। আজ সকালে চার ভাইয়ের কফিন তাঁদের দোতলা বাড়িটির নিচতলায় রেখে তাঁদের মাকে জানানো হয়। এরপর মা দোতলায় তাঁর কক্ষ থেকে নিচে নেমে ছেলেদের মরদেহ দেখতে পান।
বেলা ১১টার দিকে স্থানীয় হোছনাবাদ উচ্চবিদ্যালয় মাঠে অনুষ্ঠিত হয় চার ভাইয়ের জানাজা। এতে ইমামতি করেন তাঁদের বেঁচে থাকা একমাত্র ভাই হাফেজ মুহাম্মদ এনাম। জানাজায় কয়েক হাজার মানুষ অংশ নেন। পরে সামাজিক কবরস্থানে পাশাপাশি শায়িত করা হয় চার ভাইকে।
জানাজায় অংশগ্রহণকারীদের একজন এলাকার প্রবীণ বাসিন্দা মুহাম্মদ ইদ্রিস। তিনি বলেন, ‘একসঙ্গে চার ভাইয়ের মৃত্যু মেনে নেওয়ার মতো ঘটনা নয়। এর আগে এমন শোকাবহ ঘটনা এলাকায় ঘটেনি।’
১৩ মে রাতে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ওমানের মুলাদ্দাহ এলাকায় একটি গাড়ির ভেতর থেকে উদ্ধার হয় প্রবাসী চার ভাইয়ের মরদেহ। রয়্যাল ওমান পুলিশের ধারণা, গাড়ি চালু থাকা অবস্থায় এসির এগজোস্ট থেকে নির্গত কার্বন মনোক্সাইড গ্যাসে শ্বাস গ্রহণের ফলে ওই চারজনের মৃত্যু হয়েছে।
স্বজনেরা জানান, গত বুধবার চার ভাইয়ের মৃত্যু হলেও তাঁদের মাকে এত দিন জানানো হয়নি। আজ সকালে চার ভাইয়ের কফিন তাঁদের দোতলা বাড়িটির নিচতলায় রেখে তাঁদের মাকে জানানো হয়। এরপর মা দোতলায় তাঁর কক্ষ থেকে নিচে নেমে ছেলেদের মরদেহ দেখতে পান।
চট্টগ্রাম সমিতি, ওমানের সভাপতি মো. ইয়াসিন চৌধুরী জানান, ওই দিন সন্ধ্যায় চার ভাই ওমানের বারকা এলাকায় ছিলেন। পরে সেখান থেকে মুলাদ্দাহর দিকে রওনা দেন। রাত আটটার পর ওই চার ভাইয়ের একজন বারকা এলাকায় থাকা তাঁদের এক স্বজনকে ভয়েস মেসেজ দিয়ে জানান, তাঁরা খুবই অসুস্থ। গাড়ি থেকে বের হতে পারছেন না। তাঁরা যেখানে অবস্থান করছেন, সেই এলাকার লোকেশনও পাঠান। এর মধ্যেই রাতে মুলাদ্দাহ এলাকায় পার্ক করে রাখা গাড়িটির ভেতরে চারজনকে অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে পুলিশকে জানান দুই প্রবাসী বাংলাদেশি। এরপর পুলিশ এসে দরজা খুলে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করে।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, ভাইদের মধ্যে দুজনের গত শুক্রবার দেশে ফেরার কথা ছিল। তাই চার ভাই একটি গাড়ি নিয়ে একসঙ্গে বিয়ের কেনাকাটার উদ্দেশ্যে বের হয়েছিলেন। এর মধ্যেই পথে গাড়িতে তাঁদের মৃত্যু হয়।