গভীর রাতে ছিনতাইকারীর চাকু থেকে বাঁচলেও পাসপোর্ট-ভিসা হারিয়ে বিপাকে নারী
ঢাকা থেকে বাড়ি ফেরার পথে গভীর রাতে রাজশাহী শহরে ছিনতাইয়ের শিকার হলেন এক নারী। তখন রাত প্রায় তিনটা, ভয়ের মধ্যে ছিলেন ওই নারী। তখন ‘আমাদের মা-বোন আছে’ বলে এক রিকশাচালক ওই নারীকে আশ্বস্ত করে গন্তব্যে রওনা হন। কিছু দূর গিয়ে ওই রিকশাওয়ালা ছিনতাইকারীর রূপ নেন, ওই নারীর গলায় চাকু ধরেন। ‘শেষ করে দেব’ বলে মাথার চুল টেনে ধরে ফেলে দেওয়ার জন্য ফ্লাইওভারের পিলারের গোড়ার ওপরে উঠতে যাচ্ছিলেন। এমন সময় ওই নারী ছিনতাইকারীর পা ধরে টান দিলে তিনি পড়ে যান। তখনই চিৎকার দিয়ে দৌড়াতে শুরু করেন ওই নারী। কোনোমতে প্রাণে বাঁচেন।
রাজশাহী নগরের ভদ্রা ফ্লাইওভারের নিচে গতকাল রোববার দিবাগত রাতে এ ঘটনা ঘটে। নগরের মতিহার থানার টহল পুলিশ তাঁর ব্যাগ উদ্ধার করে দিয়েছে, কিন্তু টাকাপয়সা ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পাওয়া যায়নি। আজ সোমবার বেলা দুইটা পর্যন্তু ওই নারী থানায় কোনো অভিযোগ করেননি। তিনি বলছেন, মামলা লড়তে গেলেই টাকা লাগবে। তাঁর টাকাপয়সা নেই।
ভুক্তভোগী ওই নারীর নাম রিপা বেগম (৩৭), বাড়ি রাজশাহী নগরের কিসমত কুখণ্ডী বুধপাড়া এলাকায়। তিনি এক ছেলে, এক মেয়ে ও মাকে নিয়ে থাকেন। তাঁর স্বামী অন্যত্র বিয়ে করে চলে গেছেন। গত দুই বছর ওই নারী সৌদি আরবে ছিলেন। আট মাস আগে দেশে ফিরেছেন। তিনি জানান, সৌদি আরবে কাজ খুবই কষ্টের। সে জন্য তিনি দেশে ফিরে গত আট মাসের পাঁচ মাস ধরেই কাজ খুঁজে বেড়িয়েছেন। বয়স বেশি বলে কেউ কোনো কাজ দেয় না। কাজ না পাওয়ার কারণে তিনি আবার সৌদি আরব যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাই ঢাকা থেকে ডাক্তারি পরীক্ষা সম্পন্ন করে পাসপোর্ট-ভিসাসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে রাতের বাসে রাজশাহী আসেন। রাত প্রায় তিনটার দিকে বাস থেকে নেমে রিকশাযোগে নিজ বাড়ির উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন।
কিছু দূর যেতেই রিকশাচালকের কথাবার্তায় সন্দেহ হয় রিপা বেগমের। তখনই বুঝতে পারছিলেন, তাঁর সঙ্গে কোনো অঘটন ঘটতে যাচ্ছে। রিপা জানান, রিকশাচালক নগরের ভদ্রা ফ্লাইওভারের কাছে গিয়ে রিকশাটা পিলারের পাশে অন্ধকারের দিকে নিয়ে যান। তারপর তাঁর গলায় চাকু ধরেন।
ধস্তাধস্তির বর্ণনা দিয়ে রিপা বেগম বলেন, ‘রিকশাওয়ালাকে বলি, দেখেন ভাই আমার এখানে টাকাটুকি বেশি নাই। আপনি আমার কাগজগুলো লিয়েন না। দুয়েক টাকা আছে এগুলো আপনি নিতে পারেন। তখন আমাকে গাল দিছে। গাল শুনলে আপনার মাথা খারাপ হয়ে যাবে। বলছে, “তোকে এখানে শেষ করে ফেলব”। রাস্তা দিয়ে কেউ পার হতে লাগলে তখন আমার গলা চেপে ধরতেছে। চিৎকার করতে দিচ্ছেন না।”
রিপা বেগম জানান, চুপ না করলে তাঁকে মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছিলেন ওই রিকশাচালক। তিনি বলেন, ‘আমার মাথার চুল আর মাথাটা ধরেছে। পাকসাটা দিবে এ রকম ভাব, এ জন্য পিলারের গোঁড়ার উঁচু জায়গাটার ওপরে উঠতে গেছে, তখন আমি ওর পা ধরে টান দিয়ে ওকে দক্ষিণ পাশে ফেলেছি। ও পড়ে যাওয়ার পরে আমি দৌড় দিয়ে একটা চিৎকার দিয়েছি। ও আমার পিছু না নিয়ে আমার ব্যাগ নিয়ে দক্ষিণ দিকে চলে গেছে। পাশের বাড়ি থেকে এক নারী আমার চিৎকার শুনে সাড়া দেন। বলেন, “কে মা আমার কাছে আইসো”।’
রিকশাওয়ালা বলেছিল এখানেই তাঁর বাড়ি। সেই ভয়ে ওই নারীর কাছে না গিয়ে দৌড়াতে থাকেন রিপা বেগম। এর মধ্যে সামনে টহল পুলিশের গাড়ি পান তিনি। পরে পুলিশকে সব খুলে বলেন। ওখান থেকে খালুকে ফোন করেন। তিনি তাঁর সঙ্গে বাড়ি ফেরেন। রিপা বেগম জানান, তাঁর হারানো কাগজপত্রের জন্য তিনি দিশাহারা হয়ে পড়েছেন। আজ সকালে জাতীয় পরিচয়পত্রের জন্য আবেদন করতে গিয়েছিলেন।
এ বিষয়ে থানায় কোনো অভিযোগ দিয়েছিলেন কি না, জানতে চাইলে রিপা বেগম বলেন, মামলা লড়তে গেলেই পয়সা লাগবে। দেশে থাকতে হবে। তিনি তো দেশে থাকতেও পারছেন না। তারপরেও বিকেলে চাচার সঙ্গে পরামর্শ করে একটি সিদ্ধান্ত নেবেন। রিপা বললেন, ‘বিদেশ থেকে যে টাকা এনেছিলেন, তা দিয়ে ঋণ শোধ করেছেন। আর বাড়ির ভিটেটা নিয়েছেন। নতুন করে যাওয়ার জন্য দুই–আড়াই লাখ টাকা লাগবে। টাকার অভাবে আমার ছেলেটা এইচএসসি পরীক্ষা দিতে পারেনি।’
মতিহার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল কালাম আজাদ বলেন, তাঁদের টহল দলের সামনে ওই নারী পড়েছিলেন। তাঁরা ওই নারীর ব্যাগ উদ্ধার করে দিয়েছেন। কিন্তু জায়গাটা চন্দ্রিমা থানার মধ্যে পড়তে পারে। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে দেখা যাবে। চন্দ্রিমা থানার ওসি মনিরুল ইসলাম বললেন, তিনি ঘটনাটি শুনেছেন। তবে কোনো অভিযোগ পাননি। তদন্ত করে দেখতে হবে জায়গাটা চন্দ্রিমা থানার মধ্যে কি না।