পাকার আগেই জলাবদ্ধতায় ডুবল ধান, হাওরে কৃষকদের হাহাকার

জলাবদ্ধ জমি থেকে তোলা কাঁচা ধানগাছ দেখাচ্ছেন কৃষক মুজিবুর রহমান। শুক্রবার দুপুরে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার দেখার হাওরেছবি: খলিল রহমান

হাওরে এবার তিন একর জমিতে বোরো ধানের আবাদ করেছেন কৃষক মুজিবুর রহমান (৫৫)। পুরো পরিবারের খাওয়াদাওয়া, বাচ্চাদের লেখাপড়াসহ সব খরচই আসে এই ধান থেকে। শ্রমে-ঘামে ফলানো সেই ধান এবার পাকার আগেই তলিয়ে গেছে পানিতে। সামনে একটা বছর কীভাবে যাবে, এই চিন্তায় দিশাহারা কৃষক মুজিবুর।

সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার দেখার হাওরের উত্তর পাড়ের ইছাগড়ি গ্রামের মুজিবুর রহমানের পরিবারের সদস্য ৯ জন। গত কয়েক দিনের অতিবৃষ্টিতে হাওরে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় তাঁর মতো ফসলের ক্ষতিতে সুনামগঞ্জের হাজারো কৃষকের এখন একই অবস্থা। ফসল হারিয়ে অসহায় তাঁরা। একদিকে ফসল ডুবছে, অন্যদিকে কোনো কোনো হাওরে ফসল রক্ষায় প্রাণপণ চেষ্টা করছেন কৃষকেরা। পানিনিষ্কাশনের জন্য অনেক হাওরে বাঁধ কেটে দেওয়া হয়েছে। আবার কোথাও পাম্প বসিয়ে ব্যবস্থা করা হচ্ছে পানি সরানোর। যে বাঁধ ফসল রক্ষা করবে, কোথাও কোথাও সেই বাঁধই এখন কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে কৃষকদের জন্য।

জলাবদ্ধতায় ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হলেও জেলা কৃষি বিভাগের কাছে সেই ক্ষতির কোনো হিসাব নেই। তারা বলছে, জেলার ৬টি উপজেলায় ১ হাজার ৮১৯ হেক্টর জমি পানিতে নিমজ্জিত হওয়ার তথ্য আছে তাদের কাছে। এই তথ্যকে হাস্যকর বলছেন হাওর আন্দোলনের নেতারা। খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, শুধু উপজেলার দেখার হাওরেই দুই হাজার হেক্টর জমির ধানের ক্ষতি হয়েছে। পুরো জেলায় তা ১৫ হাজার হেক্টরের বেশি হবে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এবার সুনামগঞ্জের ১৩৭টি হাওরে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ১৪ লাখ মেট্রিক টন। হাওরে ধান কাটা শুরু হয় মধ্য এপ্রিল থেকে।

অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক মোহাম্মদ ফারুক আহাম্মেদ প্রথম আলোকে বলেছেন, জলাবদ্ধতায় ক্ষতির হিসাব পেতে আরও কয়েক দিন লাগবে। ধানগাছ যদি ৫ থেকে ৬ দিন নিমজ্জিত থাকে, তাহলে ক্ষতি হবে। এর আগে যদি পানি নেমে যায়, তাহলে ক্ষতির পরিমাণ কম হবে।

ছোট ছোট সেচপাম্প সারিবদ্ধভাবে লাগিয়ে হাওর থেকে পানিনিষ্কাশনের চেষ্টা করছেন স্থানীয় কৃষকেরা। শুক্রবার দুপুরে সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলার হালির হাওরের ইনসানপুরে
ছবি: প্রথম আলো

কৃষক মুজিবুর রহমানকে এবার দেখার হাওর থেকে শূন্য হাতে ফিরতে হবে। হাওরে তলিয়ে যাওয়া কাঁচা ধান দেখিয়ে আক্ষেপ করে বলছিলেন, ‘ধানটা পাকলে কাটার চেষ্টা করতাম। মনরে বোঝ দিতাম। কাঁচা ধান ডুবরায় (জলাবদ্ধতা) চোখের সামনে গেল। বছরটা কি-লা যাইব, এই চিন্তায় রাইতে ঘুম অয় না।’

শুক্রবার দুপুরে হাওরে মুজিবুর রহমানের সঙ্গে কথা বলার সময় পাশে ছিলেন একই গ্রামের আরেক কৃষক আতাউর রহমান (৫০)। আতাউর জানান, হাওরে তাঁর সাত একর জমির মধ্যে পাঁচ একরই তলিয়ে গেছে। বৃষ্টি হলে, পানি না কমলে বাকি জমিও তলিয়ে যাবে। এখন এসব জমিতে পানি থাকায় ধানগাছের গোড়ায় পচন ধরেছে।

একই এলাকার বৃদ্ধ রবীন্দ্র দাস (৬০) বলছিলেন, জমি আবাদ করতে গিয়ে ধারদেনা করতে হয়েছে। এখন সেই ঋণ কীভাবে দেবেন আর বাকি বছর কীভাবে যাবে, এই চিন্তায় পেয়ে বসেছে তাঁকে। রবীন্দ্র বলেন, ‘কিলা কিতা করমু। বুকটা ভাঙি যার। কিলা চলমু। সরকারে ত কুনতা করল না, সব ধান গেলগি।’ কথা বলার সময় চোখ টলমল করছিল তাঁর।

আরও পড়ুন

স্থানীয় বাসিন্দা ইউপির সাবেক সদস্য রেদোয়ান আলী জানান, দেখার হাওরে চারটি উপজেলার ২০ হাজার হেক্টরের ওপরে জমি আছে। এর মধ্যে সদর উপজেলার বেশি। হাওরের ঝাওয়া, শিয়ালমারা, বড়দৈসহ বিভিন্ন অংশে জলাবদ্ধতায় জমিতে তলিয়ে গেছে। এই এক হাওরের অন্তত দুই হাজার হেক্টর জমির ধানের ক্ষতি হয়েছে। হাওরের উতারিয়া বাঁধ, শান্তিগঞ্জ অংশে মহাসিং নদীতে বাঁধের কারণে নিচু অংশে পানি জমে আছে। এই পানিনিষ্কাশনের কোনো উদ্যোগ নেই। প্রশাসনের কর্মকর্তারা শুধু এসে দেখে গেছেন।

দেখার হাওরের মতো সদর উপজেলার জোয়ালভাঙ্গা হাওর, শান্তিগঞ্জ উপজেলার পাখিমারা হাওর, খাই হাওর, কাউয়াজুড়ি হাওর, জগন্নাথপুর উপজেলা নলুয়ার হাওর, জামালগঞ্জ উপজেলা হালির হাওর, পাগনার হাওর, ভান্ডা ও দিঘার হাওর, শাল্লায় উপজেলার ছায়ার হাওর, ধর্মপাশা উপজেলার চন্দ্রসোনারথাল হাওর, দিরাই উপজেলার চাপতির হাওর, মধ্যনগর উপজেলার টাঙ্গুয়ার হাওর, কাইলানি হাওরসহ বেশ কয়েকটি হাওরে জলাবদ্ধতায় ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

আরও পড়ুন

এর মধ্যে কয়েকটি হাওর পানিনিষ্কাশনের জন্য কৃষক ও স্থানীয় লোকজন বাঁধ কেটে দিয়েছেন। প্রশাসন থেকে নিষেধ করলেও মানুষ ফসল রক্ষায় বাঁধ কেটেছেন। জোয়ালভাঙ্গা হাওরের জিরাক এলাকার বাঁধের প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি নবী হোসেন জানান, এলাকার মানুষ ফসল রক্ষার জন্য বাঁধটি কেটে দিয়েছেন।

জামালগঞ্জ উপজেলার হালির হাওরের ইনচানপুর ও ঝুনুপুর এলাকায় স্থানীয় কৃষকেরা কয়েকটি পাম্প বসিয়ে পানি নিষ্কাশনের উদ্যোগ নিয়েছেন। একইভাবে মধ্যনগর উপজেলার বোয়ালার হাওর, এরন বিল, গজতলা হাওরের কৃষকেরা নিজেদের উদ্যোগে পাম্প বসিয়ে পানিনিষ্কাশনের উদ্যোগ নিয়েছেন।

সুনামগঞ্জ হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলন সংগঠনের সভাপতি মোহাম্মদ রাজু আহমেদ জানান, তাঁদের সংগঠনের সদস্যরা প্রতিটি হাওরে যাচ্ছেন। তাঁদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, জলাবদ্ধতায় অন্তত ১৫ হাজার হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি বলেন, অপরিকল্পিত ও অপ্রয়োজনীয় বাঁধ নির্মাণের কারণেই অনেক হাওরে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। কৃষকেরা আহাজারি করছেন। এই সমস্যা সমাধানে প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কোনো উদ্যোগ নেই। কৃষকেরা কাঁদছেন আর তারা শুধু পরিদর্শন করেই দায় সারছে।

অতিবৃষ্টিতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় তলিয়ে যাচ্ছে কৃষকের জমির বোরো ধান। শুক্রবার দুপুরে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার দেখার হাওরে
ছবি: প্রথম আলো

পাউবো সূত্রে জানা গেছে, সুনামগঞ্জের ১২টি উপজেলায় এবার ১৪৫ কোটি ব্যয় ধরে ৭১০টি প্রকল্পে ৬০২ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ সংস্কার ও নির্মাণ হচ্ছে। এই কাজের নির্ধারিত সময় ছিল ১৫ ডিসেম্বর থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের এক মাসও পরও কাজ শেষ হয়নি।

সুনামগঞ্জ পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মামুন হাওলাদার বলেছেন, বাঁধের কাজ শেষ। কাজে কোনো অবহেলা বা অনিয়ম ছিল না। অতিবৃষ্টির কারণেই মূলত হাওরে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। এখন হালকা ও মাঝারি বৃষ্টি হবে। ৬ এপ্রিলের পর ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস আছে।

আরও পড়ুন

প্রতিবাদে গণসমাবেশ

হাওরে বাঁধের কাজে অনিয়ম-দুর্নীতি ও জলাবদ্ধতায় ফসলের ক্ষতির প্রতিবাদে সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর ও তাহিরপুর উপজেলায় গণসমাবেশ করেছে হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলন। শুক্রবার সকালে তাহিরপুরে ও দুপুরে বিশ্বম্ভরপুর উপজেলায় অনুষ্ঠিত সমাবেশ বক্তব্য দেন সংগঠনের জেলা কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ রাজু আহমেদ, সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল হক, সাংগঠনিক সম্পাদক ইমরান আমহদসহ সংগঠনের উপজেলা সদস্যরা। এর আগে বৃহস্পতিবার জেলা ছাতক ও দোয়ারাবাজার উপজেলায় প্রতিবাদ সমাবেশ হয়। প্রতিটি উপজেলায় এই প্রতিবাদ সমাবেশের কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন তাঁরা।