কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার সাহেবাবাদ ইউনিয়নের প্রত্যন্ত গ্রাম জিরুইন। আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে গ্রামে ঢুকতেই ভিন্ন আবহ চোখে পড়ল। পুরো গ্রামে যেন মাতম চলছে। গতকাল বুধবার সকালে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই শহরে কর্মস্থলে যাওয়ার পথে ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পড়ে এই গ্রামের সন্তান শাহ আলম ভূঁইয়া ঘটনাস্থলেই মারা যান।
শাহ আলম ভূঁইয়ার (৪৫) সংসারে স্ত্রী, দুই মেয়ে ও দুই ছেলে আছে। দুই মেয়ে শারমিন ও মিম আক্তারের বিয়ে হয়ে গেছে কয়েক বছর আগে। দুই ছেলে এখনো ছোট। বড় ছেলে শাকিলের বয়স ১২ বছর, ঢাকায় একটি মাদ্রাসায় পড়ে। ছোট ছেলে মিনহাজ (৭) স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণিতে পড়ছে।
স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দুবাইয়ের কাছাকাছি একটি খামারে কাজ করতেন শাহ আলম। বুধবার স্থানীয় সময় সকাল ছয়টার দিকে আরেক সহকর্মীর সঙ্গে হেঁটে কাজে যাচ্ছিলেন তিনি। শাহ আলম ছিলেন সামনে, পেছনে প্রায় ১০ হাত দূরে ছিলেন ওই সহকর্মী। এ সময় মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধে ব্যবহৃত একটি ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ শাহ আলমের ওপর পড়ে। এতে ঘটনাস্থলেই তিনি মারা যান। ওই দৃশ্য দেখে জ্ঞান হারান সহকর্মী। খবর পেয়ে দেশটির পুলিশ এসে লাশ উদ্ধার করে।
আজ দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে শাহ আলমের গ্রামের বাড়িতে ঢোকার আগে দূর থেকেই কানে এল আহাজারির শব্দ। কাছে যেতেই চোখে পড়ল, ভাঙাচোরা চৌচালা টিনের ঘর ঘিরে মানুষের ভিড়। ভাঙাচোরা টিনের ঘরটি শাহ আলমের। দীর্ঘ ২৭ বছর প্রবাসে কাটালেও সেভাবে সমৃদ্ধি আনতে পারেননি।
ঘরের সামনে বসে বিলাপ করছিলেন স্ত্রী নয়না আক্তার। প্রতিবেশী নারীরা তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে বারবার বলছেন, ‘আপনেরা আমার স্বামীর লাশডা আইন্যা দেন। আমার জামাইডারে শেষবারের মতো দেখতাম চাই।’ তিনি জানান, সর্বশেষ গত মঙ্গলবার দুপুর ১২টার দিকে তাঁকে কল করেছিলেন স্বামী শাহ আলম। তখন প্রায় এক ঘণ্টা কথা হয়। এটিই ছিল তাঁদের শেষ কথা। বুধবার বেলা ১১টার দিকে জানতে পারেন, ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পড়ে তাঁর স্বামী মারা গেছেন।
নয়না আক্তার বলেন, ‘সরকার যত তাড়াতাড়ি পারে, আমার স্বামীর লাশটা দেশে এনে দিক। তিনি অনেক কষ্ট করেছেন আমাদের জন্য। কখনো নিজের সুখের কথা চিন্তা করেননি। ৩০-৩৫ হাজার টাকা বেতন পেতেন। ২০-২৫ হাজার টাকা পাঠাতেন সংসার খরচের জন্য। আমার চার ছেলে-মেয়ে। ছেলেগুলো এখনো অবুঝ। তারা কাকে আব্বা বলে ডাকবে। এমন মৃত্যু আমরা কীভাবে মেনে নেব?’
টিনের ঘরের একটি কক্ষে বসে বাবার জন্য আহাজারি করছিলেন বড় মেয়ে শারমিন আক্তার। আত্মীয়স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশী তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। শারমিন বলেন, ‘আমাদের সুখে রাখার জন্য বাবা নিজের জীবনের পুরোটাই প্রবাসে কাটিয়েছেন। ছোটবেলায় বিদেশ গেছেন, শুধু কাজই করেছেন। কখনো নিজের সুখের কথা ভাবেননি। আমার সেই বাবার এমন মৃত্যু কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না। আমার বাবার লাশ দ্রুত ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি।’
শাহ আলম দুবাইয়ে যেখানে চাকরি করেন, দুই বছর আগে সেখানে তিন মাস ছিলেন তাঁর চাচাতো ভাই হাবিবুর রহমান ভূঁইয়া। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ঘটনার সময় শাহ আলমের সঙ্গে থাকা সহকর্মীর সঙ্গে তিনি ফোনে কথা বলেছেন। তিনি ভাইয়ের পেছনে ছিলেন। দাঁত ব্রাশ করতে করতে কাজে যাচ্ছিলেন। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই ধ্বংসাবশেষ এসে ভাইয়ের ওপর পড়ে। মুহূর্তেই তাঁর মৃত্যু হয়।
আরেক চাচাতো ভাই ফজলুর রহমান ভূঁইয়া ওমানপ্রবাসী। একসময় ফজলুর ও শাহ আলম একসঙ্গে ওমানে ছিলেন। ছুটিতে দেশে আসা ফজলুর রহমান বলেন, ‘২৭ বছরের প্রবাসজীবন শাহ আলম ভাইয়ের। এর মধ্যে ওমানে ছিলেন আট বছরের মতো। সেখান থেকে দেশে এসে পরে দুবাই যান। দুবাইয়ে আছেন ১৮ বছর ধরে। তিনি বয়সে আমার বড় হলেও আমাদের সম্পর্কটা বন্ধুত্বের। দীর্ঘদিন বিদেশ করলেও সেভাবে সুবিধা করতে পারেনি ভাই। তিনি শুধু কাজই করে গেছেন। তাঁর ঘরবাড়ি দেখলে পরিস্থিতি বোঝা যায়। আমরা দ্রুত তাঁর লাশ দেশে আনার দাবি জানাই।’
বৃহস্পতিবার সকালে ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদা জাহান জিরুইন গ্রামে গিয়ে শাহ আলমের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান। উপজেলা প্রশাসন পরিবারটির পাশে থাকবে বলে অঙ্গীকার করেছেন তিনি। ইউএনও বলেন, ‘পরিবারটির অবস্থা আমি দেখেছি। উপজেলা প্রশাসন পরিবারটির পাশে থাকার চেষ্টা করবে।’ তিনি বলেন, স্বজনেরা দ্রুত লাশ দেশে আনার দাবি জানিয়েছেন। তাঁরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানিয়েছেন। আশা করছেন, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে দ্রুতই তাঁর মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা হবে।’