শিমুলগাছের ডালে ডালে বাবুইয়ের ঠোঁটে বোনা নীড়

শিমুলগাছের ডালে ডালে ঝুলে আছে বাবুই পাখির বাসা। গত শুক্রবার বিকেলে মৌলভীবাজার সদর উপজেলার মোস্তফাপুর ইউনিয়নের আজমেরু এলাকায়ছবি: প্রথম আলো

মাঠের এক প্রান্তে একটি বাড়ির সঙ্গে হালকা-পাতলা শরীর নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে শিমুলগাছ। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, গাছটির ডালে ডালে যেন ঝোপালো সবুজ পাতা। কিন্তু একটু কাছে গেলেই ভুল ভাঙে। পাতা নয়, শাখা-প্রশাখাজুড়ে ঝুলছে অসংখ্য বাবুই পাখির নীড়।

মৌলভীবাজার সদর উপজেলার মোস্তফাপুর ইউনিয়নের আজমেরু এলাকায় বার্ড পার্ক অ্যান্ড ইকো ভিলেজ-সংলগ্ন একটি বাড়ির আঙিনায় দাঁড়িয়ে থাকা শিমুলগাছটি বাবুই পাখিদের আশ্রয়ে পরিণত হয়েছে। ঝড়, বৃষ্টি কিংবা রোদ—সব প্রতিকূলতার মধ্যেই এই গাছের ডালে ডালে চলছে নতুন সংসার গড়ার আয়োজন।

ধানখেতের পাশে একটুকরা পাখিকলোনি

মৌলভীবাজার সদর উপজেলার মোকামবাজার-অফিসের বাজার সড়কটি গেছে খোলা মাঠের ভেতর দিয়ে। সড়ক ধরে এগোলে দুই পাশে চোখজুড়ানো ধানখেত। কোথাও সদ্য রোপণ করা আমনের চারা, কোথাও জমি তৈরির কাজ চলছে। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির পর সবুজ পাতায় তখনো লেগে আছে পানির ফোঁটা।

গত শুক্রবার বিকেলে সেই পথ দিয়ে যাওয়ার সময় বার্ড পার্ক অ্যান্ড ইকো ভিলেজের দক্ষিণ পাশের একটি বাড়ির দিকে চোখ পড়ে। বাড়ির দক্ষিণ পাশে, খোলা মাঠের কাছে অনেক শাখা ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে শিমুলগাছটি। শ্রাবণের মেঘলা আকাশের নিচে গাছটির প্রায় প্রতিটি ডালে ঝুলছে বাবুই পাখির বাসা। কোনোটি পুরোনো হয়ে ধূসর রং ধারণ করেছে, তবে বেশির ভাগই সবুজাভ। কোনো বাসার বুনন শেষ হয়েছে অল্প কিছুদিন আগে, আবার কোনোটি এখনো নির্মাণাধীন।

বাসার কাছে বসে আছে বাবুই পাখি। গত শুক্রবার বিকেলে মৌলভীবাজার সদর উপজেলার আজমেরু এলাকায়
ছবি: প্রথম আলো

চলছে নির্মাণের ব্যস্ততা

একটি বাবুই দূর থেকে ঠোঁটে করে নিয়ে আসছে সরু আঁশ। আরেকটি বাবুই সেই আঁশ ঠোঁটের সূক্ষ্ম নড়াচড়ায় বুনে দিচ্ছে বাসার গায়ে। কোথাও একটি পাখি বাসার ভেতরে ঢুকে আবার বেরিয়ে আসছে, যেন নতুন ঘরটি ভালোভাবে পরীক্ষা করছে। আবার কোনো বাসার সামনে বসে ডানা ঝাপটিয়ে ডাকছে আরেকটি বাবুই।

গাছজুড়ে সারাক্ষণ এমনই ব্যস্ততা। কিচিরমিচির আর ওড়াউড়িতে যেন গাছটির প্রতিটি ডাল জীবন্ত হয়ে উঠেছে। নিচে পড়ে আছে দু-একটি ছিটকে যাওয়া বাসা। বিকেলের আলো ফুরিয়ে আসার আগে যেন বাসা বোনার শেষ কাজগুলো সেরে নিতে ব্যস্ত পাখিরা। পাশে একটি সুপারিগাছে ঝুলছে আরও কয়েকটি বাসা।

কেন অনন্য বাবুইয়ের বাসা

বাবুই পাখির বাসা শুধু দেখতে সুন্দর নয়, প্রকৌশলগত দিক থেকেও বিস্ময়কর। বাসার ভেতরে থাকে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা, নিরাপদ প্রবেশপথ, ডিম রাখার আলাদা কুঠুরি। ঝোড়ো বাতাসে ভারসাম্য রক্ষার জন্য নিচের অংশে কাদামাটি বা গোবর দিয়ে বাসাকে ভারীও করে তারা। ছোট্ট পাখির এমন বুদ্ধিদীপ্ত নির্মাণশৈলীর কারণেই বাবুইকে অনেকেই ‘স্থপতি পাখি’ বলে থাকেন।

বার্ড পার্ক অ্যান্ড ইকো ভিলেজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহেদ আহমেদ চৌধুরী বলেন, একসময় গ্রামবাংলায় বাবুইয়ের বাসা সহজেই দেখা যেত, এখন তা অনেক কমে গেছে। তবে পার্কসংলগ্ন এ এলাকায় অনেক বাবুই আশ্রয় নিয়েছে। সবুজ প্রকৃতি আর পাখিদের নিপুণ কারুকাজ মিলিয়ে এলাকাটি আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।

শিমুলগাছের পাশের একটি সুপারিগাছেও বাসা বুনেছে বাবুই পাখি। গত শুক্রবার বিকেলে মৌলভীবাজার সদর উপজেলার আজমেরু এলাকায়
ছবি: প্রথম আলো

বাসা দিয়েই শুরু সংসার

গ্রীষ্মকাল বাবুইয়ের প্রজনন ঋতু। এ সময় পুরুষ বাবুই তাল, খেজুর, ধান বা ঘাসের কচি পাতার আঁশ সংগ্রহ করে বাসা বোনা শুরু করে। লম্বা টুপি আকারের প্রায় অর্ধেক বাসা তৈরি হলে স্ত্রী বাবুই এসে সেটি খুঁটিয়ে দেখে। বুনন পছন্দ হলেই কেবল পুরুষ বাবুইকে সঙ্গী হিসেবে বেছে নেয়। এরপর শেষ হয় বাসার নির্মাণকাজ।

একটি বাসা তৈরি করতে বাবুইয়ের সময় লাগে ৭ থেকে ১০ দিন। স্ত্রী বাবুই সাধারণত তিনটি ডিম পাড়ে। ডিমে তা দেওয়া শুরু হলে পুরুষ বাবুই আবার নতুন বাসা বানাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। একটি মৌসুমে সে একাধিকবার নতুন সংসারও গড়ে তুলতে পারে। ডিম ফুটে ছানা বের হতে লাগে ১০ থেকে ১৩ দিন। এরপর মা বাবুই কীটপতঙ্গ খাইয়ে বড় করে তোলে ছানাদের, পরে শেখায় শস্যদানা সংগ্রহের কৌশল। ১৫ থেকে ১৯ দিনের মধ্যেই ছানারা উড়তে শেখে।

সন্ধ্যা নামার আগে একের পর এক বাবুই ফিরছিল নিজের নীড়ে। বাতাসে দুলছিল বাসাগুলো। দূর থেকে শিমুলগাছটি তখন যেন বাবুই পাখির অভয়াশ্রম।