৮ তলার ভবনে নানা ডিভাইস নিয়ে ৬৩ বিদেশি নাগরিক কী করছিলেন, যা বলছে পুলিশ
চট্টগ্রাম নগরের খুলশী থানার জালালাবাদ আবাসিক এলাকার একটি আটতলা ভবনের ১৪টি ফ্ল্যাটে দেড় মাস ধরে ভাড়া নিয়ে অবস্থান করছিলেন ৬৩ জন বিদেশি নাগরিক।
ভবনটিতে সার্ভার, কম্পিউটার, ল্যাপটপসহ তথ্যপ্রযুক্তির বিভিন্ন সরঞ্জাম স্থাপন করা হয়েছিল। পুলিশ বলছে, এসব সরঞ্জাম ব্যবহার করে অনলাইন প্রতারণার একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিলেন তাঁরা। এ কাজে তাঁদের সহায়তা করেছে দেশীয় একটি চক্র।
পুলিশের ভাষ্য, গ্রেপ্তার ৬৩ জনের পাসপোর্ট ও ভিসা তাঁদের কাছে নেই। এসব নথি দেশীয় চক্রের সদস্যদের কাছে রয়েছে। ওই চক্রের সদস্যদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
আজ শুক্রবার বিকেলে নগরের দামপাড়া পুলিশ লাইনসের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান নগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) ফয়সাল আহম্মদ।
এর আগে গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে নগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট (সিটিইউ) ও খুলশী থানা-পুলিশের যৌথ অভিযানে জালালাবাদ আবাসিক এলাকার ওই ভবন থেকে ৬৩ জন বিদেশি নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের মধ্যে লাওসের ৩৫ জন, পাকিস্তানের ২১ জন, চীনের ৫ জন, নেপালের ১ জন ও ভিয়েতনামের ১ জন নাগরিক রয়েছেন। তাঁদের কাছ থেকে ল্যাপটপ, মুঠোফোনসহ ১৭০টি ইলেকট্রনিক ডিভাইস উদ্ধার করা হয়েছে।
এ ঘটনায় খুলশী থানায় পুলিশ বাদী হয়ে সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলা করেছে। খুলশী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুর রহিম বলেন, গ্রেপ্তার ৬৩ জনকে শুক্রবার আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডের আবেদন করা হবে। জিজ্ঞাসাবাদে অনলাইন প্রতারণার পুরো নেটওয়ার্ক সম্পর্কে তথ্য পাওয়ার চেষ্টা করা হবে।
দেড় মাস আগে ভবন ভাড়া
পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার ফয়সাল আহম্মদ বলেন, লাওস, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ায় অনলাইন প্রতারকদের বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযান চলছে। সেখানে প্রতারণার কাজ চালানো কঠিন হয়ে পড়ায় তাঁরা বাংলাদেশকে বেছে নিয়েছেন বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। দেশীয় একটি চক্রের সহায়তায় দেড় মাস আগে তাঁরা খুলশীর ওই আটতলা ভবন ভাড়া নেন। ভবনটির মালিক দুবাইপ্রবাসী।
ফয়সাল আহম্মদ বলেন, ভবনটির ১৪টি ইউনিটে সার্ভার, কম্পিউটার, ল্যাপটপসহ অনলাইন প্রতারণায় ব্যবহৃত বিভিন্ন সরঞ্জাম পাওয়া গেছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা অন্য কোনো বৈধ কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকার প্রমাণ দেখাতে পারেননি। তাঁদের কাছে পাসপোর্ট ও ভিসাও পাওয়া যায়নি। এসব নথি দেশীয় চক্রের সদস্যদের হাতে রয়েছে বলে তাঁরা জানিয়েছেন।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা কীভাবে বাংলাদেশে এসেছেন এবং তাঁদের ভিসার ধরন কী, তা জানতে পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) কাছ থেকে তথ্য নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
যেভাবে প্রতারণা করতেন
কী ধরনের প্রতারণা করা হতো, জানতে চাইলে ফয়সাল আহম্মদ বলেন, কখনো নিজেরা ওয়েবসাইট খুলে, আবার কখনো বিভিন্ন চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে মানুষের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেওয়া হতো বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। এ ছাড়া ব্যাংকসহ বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের লেনদেনের তথ্য হ্যাক করে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তবে এসব প্রতারণার সঙ্গে কারা কীভাবে যুক্ত এবং কী পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কাছ থেকে উদ্ধার করা ডিভাইসগুলো ফরেনসিক পরীক্ষার পর এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
নগর পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, গ্রেপ্তার ৬৩ জনকে চক্রের মাঠপর্যায়ের সদস্য বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। চক্রের মূল হোতাদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
এর আগে ৩ সেপ্টেম্বর রাতে কক্সবাজার শহরের একটি হোটেলে অভিযান চালিয়ে অনলাইনভিত্তিক প্রতারণার অভিযোগে ছয় বিদেশি নাগরিককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাঁদের মধ্যে পাঁচজন চীনের ও একজন তাইওয়ানের নাগরিক। তাঁদের কাছ থেকে ১ হাজার ৯৩৮টি আইফোন, ৪০টি ল্যাপটপসহ বিভিন্ন যোগাযোগ সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, রামু থানায় করা একটি অভিযোগের সূত্র ধরে ঢাকার পুলিশের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ওই হোটেলে অভিযান চালানো হয়। পরে ছয়জনের বিরুদ্ধে সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলা করা হয়। আদালত তাঁদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
পুলিশ আরও জানিয়েছিল, চীন ও তাইওয়ানের কয়েক শ নাগরিক কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভের দুটি হোটেলে অবস্থান করছিলেন। তাঁদের বিরুদ্ধে অনলাইনভিত্তিক প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে। তবে বিপুলসংখ্যক আইফোন কী কাজে ব্যবহার করা হতো এবং এর সঙ্গে অনলাইন প্রতারণার কী সম্পর্ক, সে বিষয়ে তখন বিস্তারিত তথ্য জানানো হয়নি।
কক্সবাজারের ওই ঘটনার সঙ্গে খুলশীর ঘটনার কোনো যোগসূত্র আছে কি না, জানতে চাইলে অতিরিক্ত কমিশনার ফয়সাল আহম্মদ বলেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।