বিয়ে করতে দেশে ফেরার কথা ছিল তন্ময়ের, এলেন লাশ হয়ে

সৌদি আরবে দুর্ঘটনায় নিহত রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার দেউলা গ্রামের তন্ময় আহমেদছবি: সংগৃহীত

ছুটিতে সৌদি আরব থেকে দেশে এসে বিয়ে করার কথা ছিল তন্ময় আহমেদের (২৪)। পাত্রীর পরিবারের সঙ্গে চলছিল কথাবার্তা। এ জন্য বিয়ের কেনাকাটাও করা হয়েছিল। তবে তন্ময় আহমেদ দেশে ফিরেছেন লাশের কফিনে। সৌদি আরবে দুর্ঘটনায় নিহত হওয়ার ২৯ দিন পর তাঁর লাশ গ্রামের বাড়ি রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার দেউলা গ্রামে পৌঁছেছে।

গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে তন্ময় আহমেদের লাশ ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায়। স্বজনেরা লাশ গ্রহণ করার পর আজ ভোরে লাশ গ্রামের বাড়িতে আনা হয়। বেলা আড়াইটায় নিজ গ্রামে জানাজা শেষে তন্ময়কে দাফন করা হয়।

গত ৩০ ডিসেম্বর সৌদি আরবে টাইলস তৈরির কারখানায় ক্রেন দুর্ঘটনায় তন্ময় আহমেদের মৃত্যু হয়। তিনি রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার দেউলা গ্রামের জাহিদুল ইসলামের ছেলে।

নিহত তন্ময়ের বাবা জাহিদুল ইসলাম বলেন, চার বছর আগে তাঁর বড় ছেলে তন্ময় সৌদি আরবে যান। সেখানকার হায়েল শহরের একটি টাইলস তৈরির কারখানায় গাড়িচালক হিসেবে চাকরি নেন। কারাখানা থেকে গাড়িতে করে টাইলস বিভিন্ন স্থানে পৌঁছে দেওয়া ছিল তাঁর কাজ। গত ৩০ ডিসেম্বর তন্ময় দুর্ঘটনায় মারা যান।

সহকর্মীদের বরাত দিয়ে বাবা জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘সেদিন বিকেলে ছেলের মরার খবর পাই। কারখানার ভেতরে গাড়িতে টাইলস নেওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিল। ওপর থেকে ক্রেন থেকে টাইলসের স্তূপ পড়ে ঘটনাস্থলেই মারা যায়। পরে হাসপাতালে নিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর রাখা হয় হিমঘরে।’

নিহত তন্ময়ের মা তসলিমা বেগম কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘ব্যাটার সাতে প্রায়ই কতা হতো, মরার দুই দিন আগে শেষ কতা হচে। বলেছিল, “মা বিদেশ আমাক ভালো লাগছে না, জানুয়ারির ১৫ তারিখে দেশে যাব। বিয়ের সবকিছু ঠিক করো, আমি বউয়ের জন্য সোনা কিনেছি, তোমরা অন্য বাজার করো।”’

পরিবারের সদস্যরা জানান, দেশে এসে বিয়ে করার কথা ছিল তন্ময়ের। উপজেলার ধামিন কামনগর গ্রামের পছন্দের পাত্রীর সঙ্গে বিয়ে প্রায় ঠিক হয়েছিল। কনের বাড়িতে ৩০০ জন বরযাত্রী নিয়ে যাওয়ার কথা হয়েছিল। বেশ কিছু কেনাকাটাও করা হয়েছিল। সপ্তাহখানেক আগে তন্ময়ের নির্মাণ করা বাড়ির একটি কক্ষে খাট, সোফাসহ নতুন আসবাবপত্র আনা হয়। নতুন ঘরে সেগুলো সাজানোর কথা ছিল। দেশে এসে ওই ঘরেই থাকার কথা ছিল তন্ময়ের।

বাবা জাহিদুল ইসলাম বলেন, করোনার সময় লেখাপড়া বন্ধ থাকায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল তন্ময়কে বিদেশ পাঠানোর। সে মোতাবেক লেখাপড়া বাদ দিয়ে ছেলেকে বিদেশে পাঠানো হয়েছিল। তন্ময়ের চাকরির টাকায় গ্রামে পাকা বাড়িও নির্মাণ করা হয় সম্প্রতি। নতুন পাকাবাড়িতে তাঁর থাকার কথা ছিল। তিনি স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে এক সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য ধারদেনা করে ছেলেকে সৌদি আরবে পাঠানো হয়েছিল। এখন সুখের সময় আর ছেলে আর থাকল না।’

ছেলের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর থেকে মা ও বাবা খাওয়াদাওয়া প্রায় ছেড়ে দিয়েছেন। কবে লাশ আসবে, সে অপেক্ষা করছিলেন। ২৯ দিন পর লাশ বাড়িতে পৌঁছার পর আজ সকালে বাড়িতে গিয়ে স্বজনদের আহাজারি দেখা যায়। মা তসলিমা বেগমকে ঘিরে লোকজন সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন, তবে কোনোভাবেই তাঁকে সামলাতে পারছিলেন না তাঁরা। লাশ বাড়িতে আসার খবর পাওয়ার পর এলাকার লোকজন ও আত্মীয়স্বজনেরা বাড়িতে ভিড় করেন। লাশ দেখতে আবার কেউ সান্ত্বনা এবং সমবেদনা জানাতে এসেছেন।