পুকুরে ডুবে দুই শিশুর মৃত্যু, বিয়েবাড়িতে শোকের ছায়া

বিয়ের দাওয়াত খেতে এসে পানিতে ডুবে মারা যাওয়া দুই শিশুর স্বজনদের আহাজারি। বুধবার বেলা সাড়ে তিনটার দিকে রংপুর সদর উপজেলার মমিনপুর ইউনিয়নের আরাজি গ্রামেছবি: প্রথম আলো

বাড়িতে নতুন বউ। উঠানজুড়ে আত্মীয়স্বজন। বিয়ের আনন্দে মেতে ছিলেন সবাই। কেউ নতুন বউকে ঘিরে গল্প করছিলেন, কেউ ব্যস্ত ছিলেন অতিথি আপ্যায়নে। হাসি-আনন্দে মুখর সেই বাড়িতে মুহূর্তেই নেমে আসে শোকের ছায়া। হঠাৎ পানিতে ডুবে মারা যায় দুই শিশু। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে বিয়েবাড়ির পরিবেশ।

আজ বুধবার বেলা সাড়ে তিনটার দিকে রংপুর সদর উপজেলার মমিনপুর ইউনিয়নের আরাজি গ্রামে এমন হৃদয়বিদারক দৃশ্যের দেখা মেলে। মারা যাওয়া দুই শিশু হলো রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার চম্পাতলী মিস্ত্রিপাড়া গ্রামের রুপা রানী (১০) এবং তারাগঞ্জ উপজেলার ইকরচালী ইউনিয়নের কাচনা গ্রামের পঞ্চমী রানী রায় (৮)। তারা সম্পর্কে মামাতো-ফুফাতো বোন।

বিয়ার খুশি মোর কপালো দুঃখ আনিল। মুই এখন মাওক (মেয়ে) কোনঠে পাইম। ওর বাপোক কী জবাব দেইম। মোর মাও কথা কওছে না কেন। তোরা মোর মাওক আনি দেন।
মিনতি রানী, পঞ্চমী রায়ের মা

পরিবার ও স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত সোমবার দিবাগত রাতে রংপুর সদর উপজেলার মমিনপুর ইউনিয়নের আরাজি গ্রামের রতন চন্দ্র রায় বিয়ে করেছেন তারাগঞ্জের কাংলাচড়া গ্রামে। বিয়েতে যোগ দিতে রতনের বোন ওমালা রানী তাঁর ১০ বছরের মেয়ে রুপাকে নিয়ে বাবার বাড়িতে আসেন। অন্যদিকে আট বছরের মেয়ে পঞ্চমীকে নিয়ে তারাগঞ্জের কাচনা গ্রাম থেকে আসেন রতনের বড় ভাই অজয়ের শ্যালিকা মিনতি রানী রায়।

নতুন বউকে নিয়ে বাড়িতে চলছিল আনন্দ-উচ্ছ্বাস। আজ ফিরানির অনুষ্ঠানের (বরের বাড়িতে অনুষ্ঠান) জন্য স্বজনেরা রতনদের বাড়িতেই অবস্থান করছিলেন। এর মধ্যেই বেলা দেড়টার দিকে গোসল করতে পুকুরে যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয় রুপা ও পঞ্চমী।

স্থানীয় লোকজনের ভাষ্য, বেলা দেড়টার দিকে আরাজি গ্রামের সুধীর রায়ের পুকুরে যায় রুপা ও পঞ্চমী। এরপর দীর্ঘ সময় তাদের দেখা না পেয়ে স্বজনেরা খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। পরে স্থানীয় লোকজন পুকুরে নেমে খোঁজ শুরু করেন। বেলা তিনটার দিকে পানির নিচ থেকে দুই শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

মামার বিয়েতে কত আনন্দ করবে এ জন্য আমার কলিজা আমার সাথে আসছিলো। আনন্দে খুশিও ছিল। মেয়ে আমার সঙ্গে কথা বলছে না, মা ডাকছে না। মেয়েটা আমার সামনে পড়ে আছে। মেয়েকে বিয়ের আনন্দ দেখাতে এনেছিলাম, এখন মেয়ের লাশ নিয়ে কীভাবে বাড়ি ফিরব? কাকে নিয়ে বাঁচবো ভগবান।
ওমালা রানী, রুপা রানীর মা

আজ বিকেলে সরেজমিনে দেখা যায়, আরাজি গ্রামের ওই পুকুরপাড়ে মানুষের ভিড়। পুকুর থেকে উদ্ধার হওয়া রুপা ও পঞ্চমীর মরদেহ বাড়ির উঠানে পাশাপাশি পড়ে আছে। আহাজারি করছেন স্বজনেরা। মেয়েকে হারিয়ে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন শিশু দুটির মায়েরা।

রুপার নিথর মুখের দিকে তাকিয়ে বিলাপ করতে করতে মা ওমালা রানী বলছিলেন, ‘মামার বিয়েতে কত আনন্দ করবে এ জন্য আমার কলিজা আমার সাথে আসছিলো। আনন্দে খুশিও ছিল। মেয়ে আমার সঙ্গে কথা বলছে না, মা ডাকছে না। মেয়েটা আমার সামনে পড়ে আছে। মেয়েকে বিয়ের আনন্দ দেখাতে এনেছিলাম, এখন মেয়ের লাশ নিয়ে কীভাবে বাড়ি ফিরব? কাকে নিয়ে বাঁচবো ভগবান।’

পঞ্চমীর মা মিনতি রানী বিলাপ করতে করতে মূর্ছা যাচ্ছিলেন। জ্ঞান ফিরলে মেয়ের দিকে ছুটে যেতে ধরেন। স্বজনের আটকে রাখেন। তখন মিনতি রানী বিলাপ করছিলেন, ‘বিয়ার খুশি মোর কপালো দুঃখ আনিল। মুই এখন মাওক (মেয়ে) কোনঠে পাইম। ওর বাপোক কী জবাব দেইম। মোর মাও কথা কওছে না কেন। তোরা মোর মাওক আনি দেন।’

দুই শিশুর মৃত্যুতে এলাকায়ও শোকের ছায়া নেমে এসেছে বলে জানালেন স্থানীয় ইউপি সদস্য দুলাল হোসেন। তিনি বলেন, নতুন বউকে ঘিরে যে বাড়িতে আত্মীয়স্বজনের ভিড় ছিল, সেই উঠানেই এখন শোকাহত মানুষ। খুব হৃদয়বিদারক ঘটনা। সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা নেই। স্থানীয় লোকজনই পুকুর থেকে শিশু দুটির লাশ উদ্ধার করেছেন। ঘটনাস্থলে খবর পেয়ে পুলিশ এসেছে।