গত শুক্রবার সকালে সিংড়া উপজেলার কংসপুর এলাকার কফিল সেতুতে গিয়ে দেখা যায়, মরা গাঙ্গিনা খাল কিছুটা বাঁ দিকে ঘুরে গদাই নদীতে মিশেছে। খালের দুই ধারে শুরুতে কিছু বাড়িঘর থাকলেও ভাটিতে হাজার হাজার বিঘা আবাদি জমি রয়েছে। খালের উজানে দয়ারবিল, বন্দরবিল, কমা-কামারের চোরা, লেলিয়ারবিল, চাইলাকুড়াবিলসহ ১০টি বিল রয়েছে। আশপাশে শেরকোল, কান্দিপাড়া, মাদারি গ্রাম, বন্দর, মাঝগ্রাম, মাঝপাড়া, কংসপুর, সোনাপুর, পাঁচবাড়িয়া, খাগোড়বাড়িয়া, বড় বেলঘরিয়া, মাদারি গ্রামসহ ১৩টি গ্রাম রয়েছে। এ এলাকার আবাদি জমিতে এখনো পানি জমে আছে। ফলে কৃষকেরা রোপা আমন ধান কাটতে পারছেন না। 

এদিকে মরা গাঙ্গিনা খালের মধ্যে মাটির পাড় তুলে বেশ কয়েকটি পুকুর খনন করেছেন স্থানীয় ব্যক্তিরা। কয়েকটি পুকুরের চারপাশ জাল দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। কংসপুর গ্রামের এক বাসিন্দা বলেন, খাল দখল করে লোকজন পুকুর কেটেছেন। খালে নাকি তাঁদের ব্যক্তিগত জমি আছে। তাঁদের কারণে সাধারণ কৃষকের ক্ষতি হচ্ছে। সরকারি লোকজন শুধু ঠিকাদার নিয়োগ করে বসে আছেন। খাল যাঁরা দখল করে আছেন, তাঁদের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া কি তাঁদের দায়িত্ব নয়? 

কংসপুরের  আবদুল মতিন বলেন, ৩০ বছর আগেও এই খালে সারা বছর পানির প্রবাহ ছিল। মাঠ থেকে ফসল কেটে নৌকায় করে এই খাল হয়ে বাড়িতে আসতেন তিনি। বর্ষা শেষ হতেই আশপাশের সব কারখানার পানি এই খাল হয়ে গদাই নদীতে যেত। তখন তাঁরা পরের ফসল চাষ করার প্রস্তুতি নিতেন। এখন খাল দখল করে পুকুর কাটা হয়েছে। 

পুঁটিমারির মোক্তার আলী বলেন, ‘খাল দখল হওয়ার পর থ্যাকি বিলের পানি নামতে দেরি হচ্ছে। অনেক খরচ করে ফসল তুলতে হচ্ছে। আমরা দখলদারদের কাছে জিম্মি হয়া গিছি।’

  দখলদারদের একজন মজনু সর্দার। তাঁদের তিন ভাইয়ের দখলে খালের সাড়ে তিন বিঘা জমি। মজনু বলেন, তাঁরা গ্রামের রাবেয়া খাতুনের কাছ থেকে খালের কিছু জমি কিনে নিয়েছেন। তিনি ওই জমির দলিলও দেখান। খালের অপর তিন দখলদার সোহরাব মৃধা, হেলাল সর্দার ও জিয়াউর রহমানও দলিল দেখান। 

এ বিষয়ে শেরকোল ইউনিয়নের ভূমি সহকারী কর্মকর্তা আবদুল কুদ্দুস সরকার জানান, অনেক আগে খালের কিছু জমি বন্দোবস্ত দেওয়া হয়েছিল। 

স্থানীয় লোকজন বলেন, কার্যাদেশ পাওয়ার  পর রাজশাহীর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স রাজু এন্টারপ্রাইজের কর্মীরা সিংড়ার শিববাড়ী এলাকায় ভেকু মেশিন নিয়ে খননকাজ শুরু করতে গেলে স্থানীয় দখলদারেরা তাঁদের ওপর হামলা চালান। বিষয়টি তাৎক্ষণিক উপজেলা প্রশাসনকে জানালে তাঁরা কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় কর্মীরা ফিরে আসেন। এরপর আর কোনো ঠিকাদার ওই খাল খনন করতে যাননি। 

রাজু এন্টারপ্রাইজের মালিক রহমত আলী শনিবার মুঠোফোনে বলেন, তিনি কার্যাদেশ পেয়ে মরা গাঙ্গিনা খাল খননের জন্য ভেকু মেশিনসহ কর্মীদের পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু এলাকার কিছু লোকজন তাঁর ভেকু মেশিন পুড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে কর্মীদের জিম্মি করে রাখেন এবং চাঁদা দাবি করেন। পরে বিকাশের মাধ্যমে ৩০ হাজার টাকা পাঠিয়ে কর্মীদের মুক্ত করেন। পরে তিনি জানতে পারেন, স্থানীয় এক জনপ্রতিনিধির ইন্ধনে এ ঘটনা ঘটে। ফলে কোনো ঠিকাদার আর সেখানে যাননি।

এ বিষয়ে বরেন্দ্র কর্তৃপক্ষের আইনজীবী আবদুল মালেক শেখ জানান, খাল-বিল ও নদী-নালার জমি ইজারা বা বন্দোবস্ত দেওয়ার বিধান নেই। প্রশাসনের কিছু অসৎ কর্মকর্তাকে টাকা খাইয়ে কিছু লোক শ্রেণি পরিবর্তন করে মরা গাঙ্গিনার কিছু জমি নিজ নামে করে নিয়েছে। দখলদারেরা আদালতে মামলা করে খাল খননে নিষেধাজ্ঞা চেয়েছিলেন। কিন্তু এ বছরের শুরুতে শুনানি শেষে তা নাকচ করে দেওয়া হয়েছে। কারণ, সিএস ও এসএ খতিয়ানে খালের নাম উল্লেখ আছে। ফলে খাল খননে কোনো বাধা নেই। 

বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নাটোর কার্যালয়ের সহকারী প্রকৌশলী আহাসানুল করিম বলেন, জলাবদ্ধতা দূরীকরণ ও বৃষ্টির পানি ধরে রাখার উদ্দেশ্যে প্রায় আড়াই কোটি টাকা ব্যয়ে মরা গাঙ্গিনা খাল খননের প্রকল্প নেওয়া হয়। প্রকল্পটি চূড়ান্ত করার আগে সিংড়া উপজেলা সমন্বয় সভার অনুমোদনও নেওয়া হয়। তবু কয়েকজন দখলদারের হামলার কারণে খননকাজ শুরু করা যায়নি। দখলদারদের পেছনে এলাকার প্রভাবশালীরা রয়েছেন। তাঁরা এ সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছেন।