আরিচায় যমুনার তীরে বারুণী স্নানে পুণ্যার্থীদের ঢল, পাঁচ দিনব্যাপী মেলা
হিন্দু সম্প্রদায়ের উৎসব বারুণী স্নান উপলক্ষে মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলায় যমুনা নদীর তীরে মানুষের ঢল নেমেছিল। আজ মঙ্গলবার যথাযথ ধর্মীয় উপচার ও ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে পুণ্যার্থীরা এ স্নান উৎসবে অংশ নেন। এ উপলক্ষে বসেছে মেলাও। শিবালয় বন্দর ব্যবসায়ী সমাজকল্যাণ সমিতি ও স্থানীয় শিবালয় ইউনিয়ন পরিষদের উদ্যোগে এ উৎসবের আয়োজন করা হয়।
স্থানীয় লোকজনের মতে, প্রায় ২০০ বছরে ধরে আরিচায় যমুনা নদীর তীরে পালিত হয়ে আসছে এই বারুণী স্নান। প্রতিবছরের মতো এবারও মানিকগঞ্জ, রাজবাড়ী, পাবনা, ফরিদপুরসহ দেশের বিভিন্ন জেলা এবং রাজধানী ঢাকা থেকে বিপুলসংখ্যক পুণ্যার্থীর সমাগম ঘটে। এ ছাড়া পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, বিশেষ করে কলকাতা থেকেও অনেক ভক্ত এ স্নানে অংশ নিতে আসেন। বারুণী স্নানকে কেন্দ্র করে আয়োজিত এই মেলা শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি এ অঞ্চলের মানুষের জন্য একটি বড় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে।
বারুণী স্নান ঘিরে আরিচা ঘাটসংলগ্ন যমুনা নদীর তীরে বসেছে পাঁচ দিনব্যাপী মেলা। সাধারণত এই মেলা তিন দিন স্থায়ী হলেও অনুকূল আবহাওয়া ও পরিস্থিতির কারণে অনেক সময় তা সাত থেকে দশ দিন পর্যন্তও গড়ায়। এ বছর ঈদ সামনে রেখে মেলার সময় আরও বাড়তে পারে বলে স্থানীয় লোকজন জানিয়েছেন।
মেলায় নদীর তীরবর্তী চরে বসেছে নানা ধরনের দোকানপাট। হ্যান্ডিক্রাফট, খেলনা, প্রসাধনী, সাজসজ্জার সামগ্রী, বাঁশ ও কাঠের তৈরি পণ্য, বেতের জিনিস, মাটির পাত্র, লোহার সামগ্রীসহ গৃহস্থালির নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন পণ্য বিক্রি হচ্ছে। পাশাপাশি মিষ্টি, বিন্নি, খৈ, বাতাসা ও অন্যান্য মুখরোচক খাবারেরও সমাহার রয়েছে। শিশুদের বিনোদনের জন্য রয়েছে নাগরদোলা, দোলনা, ট্রেন রাইডসহ বিভিন্ন খেলাধুলার আয়োজন। এ ছাড়া বেলুন, খেলনা ও নানা আকর্ষণীয় সামগ্রীর দোকান শিশুদের কাছে বাড়তি আনন্দ যোগ করছে।
তেওতা জমিদারবাড়ির প্রধান পুরোহিত শংকর প্রসাদ চৌধুরী বলেন, প্রায় ২০০ বছরের ঐতিহ্য বহন করে আসছে মহাবারুণী স্নান। প্রতিবছরের মতো এবারও বিপুলসংখ্যক ভক্তের সমাগম ঘটেছে। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এই স্নানের মাধ্যমে যমুনার জলে অবগাহন করলে মানুষের পাপ মোচন হয়। এই আয়োজন শুধু ধর্মীয় আচারেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি ভ্রাতৃত্ব ও মিলনের এক অনন্য বন্ধনে মানুষকে আবদ্ধ করে। স্নান শেষে ভক্তদের পারস্পরিক আলিঙ্গন ও সৌহার্দ্যের মধ্য দিয়ে এক মিলনমেলার আবহ সৃষ্টি হয়, যা বারুণী স্নানের অন্যতম প্রধান তাৎপর্য বহন করে।
শিবালয় বন্দর ব্যবসায়ী সমাজকল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক এস এম রাজু আহম্মেদ জানান, বারুণী স্নানে আগত পুণ্যার্থীদের সুবিধার্থে বন্দর সমিতির পক্ষ থেকে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়। স্নান শেষে কাপড় পরিবর্তনের জন্য আলাদা প্যান্ডেল ও খাবারের ব্যবস্থা ছিল। স্থানীয় সংসদ সদস্য এস এ জিন্নাহ কবীরের সহযোগিতার পাশাপাশি সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উপজেলা প্রশাসন, শিবালয় থানা–পুলিশ, কোস্টগার্ড, ফায়ার সার্ভিস এবং আনসার ও গ্রাম পুলিশের সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন।
শিবালয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনিষা রানী কর্মকার বলেন, বারুণী স্নান ঘিরে আগত পুণ্যার্থীদের নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্বিক প্রস্তুতি নেওয়া হয়। ঘাট এলাকায় শৃঙ্খলা বজায় রাখা, স্নানার্থীদের নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করা এবং যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।