ট্রেনের টিকিট না থাকার পরেও শীতাতপনিয়ন্ত্রিত (এসি) বগিতে ওঠেন। টিকিটবিহীন যাত্রীদের বগি থেকে বের করে দিতে রেলকর্মীদের অনুরোধ জানান টিকিটধারী যাত্রীরা। এ নিয়ে শুরু হয় কথা-কাটাকাটি, একপর্যায়ে হাতাহাতি। মুঠোফোনের মাধ্যমে ফোন করেন বিনা টিকিটের এক যাত্রী। অপর প্রান্তের ব্যক্তিকে বলেন, স্টেশনে ১০-১২ জন লোক নিয়ে থাকতে। স্টেশনে ট্রেন থামতেই হুড়মুড় করে ওঠে পড়েন আগে থেকে থাকা লোকগুলো। বগির ভেতরে থাকা যাত্রীদের মারধর করতে থাকেন। ট্রেন ছাড়তেই নেমে পড়েন।
টিকিটধারী যাত্রীদের ওপর এভাবে হামলার ঘটনা ঘটেছিল ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী চট্টলা এক্সপ্রেস ট্রেনে। রেলওয়ের তদন্তে যাত্রীদের মারধরের প্রকৃত অবস্থা জানা যায়। এ ঘটনা ঘটে ৬ এপ্রিল সন্ধ্যায় নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার মেথিকান্দা স্টেশনে।
ট্রেনের যাত্রীদের ওপর এমন হামলার ঘটনায় বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা আনিসুর রহমানকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে রেলওয়ে। কমিটি সম্প্রতি প্রতিবেদন জমা দিয়েছে।
এমন ঘটনার জন্য রেলের অন্তত আটজন কর্মীর অবহেলার প্রমাণ পেয়েছে কমিটি। তাঁদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
এ ছাড়া যেসব স্টেশন থেকে বিনা টিকিটের যাত্রী বেশি ওঠে এবং উচ্ছৃঙ্খল আচরণ করেন, সেসব স্টেশনে আন্তনগর ট্রেনের স্টপেজ বাতিলেরও পক্ষে মত দিয়েছেন কমিটির সদস্যরা। বিশেষ করে নরসিংদী ও মেথিকান্দা স্টেশনে এই ধরনের ঘটনা ঘটে বেশি বলে প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত কমিটি।
তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা আনিসুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ট্রেনের টিকিটধারী যাত্রীদের ওপর হামলার ঘটনা মেনে নেওয়ার মতো না। যাঁদের অবহেলা ও গাফিলতিতে এ ঘটনা ঘটেছে, তাঁদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। কিছু কিছু স্টেশনে এ ধরনের ঘটনা ঘটে। তার প্রতিরোধে পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে বলা হয়েছে।
যা ঘটেছিল
৬ এপ্রিল বিকেল পৌনে ৫টায় ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশে যাত্রা করে চট্টলা এক্সপ্রেস ট্রেন। ওই ট্রেনে বগি ছিল ১৮টি। ‘গ’ বগিতে টিকিটধারী যাত্রীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে।
তদন্ত কমিটি মারামারির ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে চট্টলা এক্সপ্রেসে এবং রেলের বিভিন্ন দপ্তরে দায়িত্বরত ১৩ কর্মীর সঙ্গে কথা বলে। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ভ্রমণকারী টিকিট পরীক্ষক (টিটিই), গার্ড বা পরিচালক, খালাসি, সহকারী স্টেশনমাস্টার, কাটারিং ব্যবস্থাপক, রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর পরিদর্শক ও সিপাহি, রেলওয়ে থানার কনস্টেবল।
চট্টলা এক্সপ্রেসে দায়িত্বরত রেলের কর্মীরা জানান, ‘ক’, ‘খ’ ও ‘গ’ বগি শীতাতপনিয়ন্ত্রিত (এসি) বগি। কিন্তু এসব বগিতে স্ট্যান্ডিং টিকিট ও বিনা টিকিটের প্রচুর যাত্রী ছিলেন। অথচ তাঁদের এখানে আসার সুযোগ নেই। টিকিটধারী যাত্রীরা বারবার এসব যাত্রীদের বগি থেকে বের করে দেওয়ার অনুরোধ জানান। এ নিয়ে কথা–কাটাকাটি হয়।
পরে আরএনবি, রেলওয়ে পুলিশ ও টিটিইদের সহায়তায় এসি বগি থেকে বিনা টিকিটের যাত্রীদের বের করে দেওয়া হয়। ‘গ’ বগির এক পাশে তালা লাগিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু ১০-১২ জন যাত্রী তালা ভেঙে আবার প্রবেশ করেন। এরপর তাঁরা যাত্রীদের সঙ্গে মারামারিতে লিপ্ত হন। এর মধ্যে ওই যাত্রীদের একজন ফোন করে মেথিকান্দা স্টেশনে ১০-১২ জন লোককে থাকতে বলেন। বগিগুলোতে যাত্রীদের চাপ থাকায় রেলওয়ে পুলিশ ও আরএনবির সদস্যরা ঠিক সময়ে আসতে পারেননি। এর মধ্যে মেথিকান্দা স্টেশনে ট্রেন থামে। সঙ্গে সঙ্গে বাইরে থেকে ১০-১২ জন লোক ট্রেনের বগির ভেতর এসে যাত্রীদের এলোপাতাড়ি মারধর করতে থাকেন। রেলের কর্মীদেরও মারতে চেষ্টা করেন। বগির ভেতরে থাকা অন্য যাত্রীরা চেষ্টা করেও তাঁদের থামাতে পারেননি। পরে ট্রেন ছেড়ে দিলে হামলাকারীরা দ্রুত নেমে পড়েন।
এই হামলায় বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি–ইচ্ছুক এক ছাত্র, তাঁর সঙ্গে পরিবারের দুই সদস্য এবং এক চাকরিজীবী আহত হয়েছেন।
বারবার ঘটে এসব ঘটনা
আন্তনগর ট্রেনে এসি বগির যাত্রীদের ওপর হামলার ঘটনায় বেশ কিছু সুপারিশ করেছে তদন্ত কমিটি। এর মধ্যে রয়েছে যেসব স্টেশনে বিনা টিকিটের যাত্রী বেশি ওঠেন এবং উচ্ছৃঙ্খল আচরণ করেন, সেসব স্টেশনে আন্তনগর ট্রেনের স্টপেজ বাতিল করা। কমিটি নরসিংদী ও মেথিকান্দা স্টেশনের নাম উল্লেখ করেছে।
কমিটির মতে, নরসিংদী ও মেথিকান্দা স্টেশনে বারবার এ ধরনের ঘটনা ঘটে। তাই তা প্রতিরোধে সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, যুবসমাজের প্রতিনিধি, স্থানীয় প্রশাসন ও থানা, স্টেশন ও রেলওয়ের দায়িত্বরত সদস্যদের সমন্বয়ে কমিটি গঠন করা। যাতে এ ধরনের সমস্যা হলে সমাধানে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে কমিটি।
প্রতিটি আন্তনগর কোচে স্ট্যান্ডিং টিকিটধারী (দাঁড়িয়ে যাওয়া) যাত্রীদের জন্য আলাদা কোচ সংযোজন করতে হবে। কোনোভাবেই এসি কোচে স্ট্যান্ডিং যাত্রী প্রবেশ করে নিরাপত্তা বিঘ্নিত করতে না পারে, সে জন্য প্রতিটি কোচে অ্যাটেনডেন্ট নিয়োগ এবং ট্রেনে আবশ্যিকভাবে একজন কন্ডাক্টর গার্ড থাকতে হবে।
ট্রেনে দায়িত্বরত জিআরপি ও আরএনবির সদস্যরা যাতে সুবিধামতো জায়গায় বসে না থেকে দায়িত্বরত গার্ড ও অ্যাটেনডেন্টদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক সমন্বয় করবেন। বিনা টিকিটের যাত্রী প্রতিরোধে প্রতি কোচে অ্যাটেনডেন্ট নিয়োগ দিতে হবে এবং দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
৮ কর্মীর গাফিলতি
তদন্ত কমিটি আন্তনগর ট্রেনে যাত্রীদের ওপর বিনা টিকিটের যাত্রীদের হামলার ঘটনায় অন্তত আট কর্মীর গাফিলতির প্রমাণ পেয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সুপারিশ করেছে কমিটি।
তাঁদের মধ্যে খালাসি মোশাররফ হোসেনকে চট্টলা এক্সপ্রেস ট্রেনে আর দায়িত্ব না দেওয়া। বগির ভেতর সমস্যার সমাধান করতে ব্যর্থ হওয়ায় দুই আরএনবি সদস্য সিপাহি এস এম মুস্তাফিজুর রহমান ও মো. আনিসুল ইসলাম পাটোয়ারীকে ভবিষ্যতে চলন্ত কোনো ট্রেনে দায়িত্ব না দেওয়া।
ট্রেনের দায়িত্বে থাকা চার টিটিইদের এ ধরনের ট্রেনে দায়িত্ব না দেওয়া এবং তাঁদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার সুপারিশ করা হয়। তাঁদের মধ্যে ট্রেনে অনুপস্থিত থাকা টিটিই তানজিম ফরাজীকে অন্যখানে বদলি করতে বলা হয়েছে। রেলকর্মী জাহেদুল হককে অন্য কোনো ট্রেনে বদলি।