‘ট্রান্সজেন্ডার’ আখ্যা দিয়ে বুলিং করা হচ্ছে, বললেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অব্যাহতি পাওয়া ছাত্রদল নেতা

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার সৈয়দাবাদ সরকারি আদর্শ মহাবিদ্যালয়ের শাখা ছাত্রদলের সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক রেদোয়ান ইসলামকে সংগঠন থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে রেদোয়ান ট্রান্সজেন্ডার হিসেবে প্রচার হওয়ার পর জেলা ছাত্রদল এই পদক্ষেপ নেয়। যদিও কেউ ট্রান্সজেন্ডার হলে ছাত্রদলে যুক্ত হতে পারবেন না, এমন কোনো বিষয় সংগঠনটির গঠনতন্ত্রে নেই।

ওই ঘটনার পর রেদোয়ান ইসলাম তাঁর ফেসবুক পেজ ‘রিহিয়া রিহি’ থেকে পোস্ট দিয়ে জানিয়েছেন, তিনি ট্রান্সজেন্ডার নন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁকে ‘ট্রান্সজেন্ডার’ বলে বুলিং করা হচ্ছে। এতে তিনি সামাজিকভাবে হেয় ও মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তাঁর পরিবারের সদস্যরাও ভোগান্তিতে পড়েছেন।

রেদোয়ান ইসলাম ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবার সায়েদাবাদ গ্রামের জাহাঙ্গীর আলম ভূঁইয়ার ছেলে। তিন ভাই ও তিন বোনের মধ্যে রেদোয়ান ছোট। তিনি উপজেলার সৈয়দাবাদ সরকারি আদর্শ মহাবিদ্যালয়ের স্নাতক (পাস) দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। গত শনিবার সৈয়দাবাদ সরকারি আদর্শ মহাবিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের কমিটি ঘোষণা করা হয়। এতে রেদোয়ানকে সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক করা হয়।

এরপর ফেসবুকে রেদোয়ান ইসলাম ‘ট্রান্সজেন্ডার’ বলে আলোচনা–সমালোচনা শুরু হয়। গত রোববার ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা ছাত্রদল রেদোয়ানকে দল থেকে অব্যাহতি দিয়ে বিজ্ঞপ্তি দেয়।

ওই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শাখার সিদ্ধান্ত মোতাবেক কসবা উপজেলা সৈয়দাবাদ আদর্শ মহাবিদ্যালয় ছাত্রদলের সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক রেদোয়ান ইসলামকে ব্যক্তিগত তথ্য গোপন রাখা ও সংগঠনের নিয়মবহির্ভূত কার্যক্রমের দায়ে তার প্রাথমিক সদস্যপদসহ সকল পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হলো।’ যদিও ছাত্রদলের গঠনতন্ত্রের অনুচ্ছেদ ৬: ১–এর ‘খ’ অনুযায়ী, ‘বাংলাদেশের নাগরিক এবং অধ্যয়নরত ছাত্রছাত্রীবৃন্দই কেবল মাত্র জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সদস্য/সদস্যা হওয়ার যোগ্য বলে বিবেচিত হবে।’ কোনো ট্রান্সজেন্ডার কেউ ছাত্রদলের সদস্য হতে পারবেন না, এমন কিছু গঠনতন্ত্রে উল্লেখ নেই।

ওই ঘটনায় গতকাল বিকেলে রেদোয়ান ইসলাম তাঁর ফেসবুক পেজ ‘রিহিয়া রিহি’ থেকে একটি পোস্ট দেন। এতে তিনি লেখেন, ‘আমি আপনাদেরই রেদোয়ান। বর্তমানে আমাকে নিয়ে যে বিষয়টি নিয়ে সবাই সমালোচনা করছেন, সেটার স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়ার জন্যই এই পোস্ট। আমি পরিষ্কারভাবে জানাতে চাই—আমি ট্রান্সজেন্ডার নই। আমি একজন সম্পূর্ণ ছেলে এবং একজন সংস্কৃতি কর্মী (Co-Artist)। আমি দীর্ঘদিন ধরে সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের সাথে যুক্ত। আমার এই পেশা বা কিছু কনটেন্টের কারণে যদি কেউ কষ্ট পেয়ে থাকেন, তার জন্য আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেসব কনটেন্টের কারণে আপনারা কষ্ট পেয়েছেন, সেগুলো আমি ইতোমধ্যে রিমুভ করেছি।’

এ বিষয়ে রেদোয়ান ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি ট্রান্সজেন্ডার নই। আমি কোনো লিঙ্গ পরিবর্তন করিনি। এটি আমার বিরুদ্ধে ভুল প্রচারণা। আমি মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছি। আমার পরিবারও এ জন্য ভোগান্তিতে পড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বুলিং, নির্যাতন ও হুমকির শিকার হচ্ছি। ২০২৪ সালে জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহে নৃত্যে আমি কসবা উপজেলা ও জেলায় প্রথম হয়ে বিভাগীয় পর্যায়ে গিয়েছি। ছাত্রদলের কমিটিতে আমাকে সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক পদে রাখা হয়েছিল। ৬-৭ বছর ধরে আমি অনলাইনে কাজ করি। তখন কেউ কিছু বলে নাই। যখন ছাত্রদলের পদ দেওয়া হয়েছে, তখন সবাই উঠেপড়ে লেগেছে।’

রেদোয়ান ইসলাম আরও বলেন, ‘আমি “রিহিয়া রিহি” নামের ফেসবুক আইডি আমি চালাই। কিন্তু বাস্তবে আমি ছেলে। যখন দেশে প্রথম টিকটক আসে, তখন থেকেই টিকটক করি। আমি বিভিন্ন কনটেন্টের ভিডিও আপলোড করে মাসে ১৫-২০ হাজার রোজগার করি। এটা আমার আয়ের উৎস।’

এ বিষয়ে জেলা ছাত্রদলের সদস্যসচিব সমীর চক্রবর্তী বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ট্রান্সজেন্ডার নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছিল। তাই তাঁকে (রেদোয়ান) অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। কেউ যদি পেশাগত কারণে কোনো রূপধারণ করেন, আমাদের তাতে আপত্তি নেই। আর রেদোয়ান যদি ছেলের স্বপক্ষে তথ্য প্রমাণ দিতে পারেন, আমরা তাঁকে স্বপদে বহাল করব। জেলা কমিটির কাছে প্রমাণাদি জমা দিতে হবে।’