গোলগাল মুখের ছোট্ট ফাহিমকে দেখলে বোঝার উপায় নেই, এত সব জটিল রোগের সঙ্গে লড়ে যাচ্ছে সে। শারীরিক যন্ত্রণা সয়ে বাবার সঙ্গে দোকানে বসে। দেড় কিলোমিটার দূরের বাড়ি থেকে চা ভর্তি ফ্লাস্ক বহন করে আনে দোকানে। ক্রেতাদের এটা-সেটা এগিয়ে দেয়। এর মধ্যে খুব খারাপ লাগলে কেবল একটু বিশ্রাম নেয়।
কক্সবাজারের টেকনাফ স্থলবন্দর এলাকায় ফাহিমকে প্রায় দেখা যায় চায়ের ফ্লাস্ক হাতে হেঁটে যেতে। নিষ্পাপ মুখে যন্ত্রণার ছাপ। তবু ক্লান্তি নেই। স্থলবন্দর এলাকায় একটি চায়ের দোকান চালান ফাহিমের বাবা আমির হাকিম। সেখানেই ফ্লাস্ক নিয়ে যায় সে। বাবাকে সাহায্য করতে বসে দোকানেও।
নাফ নদীর তীরে পাহাড়ঘেরা কেরুনতলীতে একটি ঝুপড়ি ঘরে থাকে আট বছর বয়সী মো. ফাহিম। তিন ভাইবোনের মধ্যে সবার বড় সে। তিন বছর ধরে কিডনি, লিভারসহ নানা জটিলতায় ভুগছে সে। ফাহিমের বাবা আমির হাকিম একসময় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালাতেন। ছেলের চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে সেই অটোরিকশা বিক্রি করেছেন। এখন এই চা-দোকানই রোজগারের একমাত্র পথ।
গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় টেকনাফ-কক্সবাজার সড়কের পর্যটন মোটেল ‘নেটং’-এর সামনে দেখা হয় ফাহিমের সঙ্গে। ছাতা হাতে সড়কের এক পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল সে। হাতে চায়ের বড় ফ্লাস্ক নিয়ে হাঁটতে কষ্ট হচ্ছিল। কথা বলতে বলতে ফাহিম তার বাড়িতে নিয়ে যায়। সেখানে গেলে আলাপ হয় তার মা-বাবার সঙ্গে।
জীর্ণ ঝুপড়ি ঘরের এক পাশে বসে ফাহিমের মা ছেনুয়ারা বেগম (৩৫) চোখ মোছেন। বলেন, ছেলের চিকিৎসা করানোর সামর্থ্য নেই তাঁদের। চোখের সামনে ছেলেটা কষ্ট পাচ্ছে। তিন বছর ধরে বন্ধ তার পড়াশোনাও। তবু সে ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখে।
ফাহিমের বাবা আমির হাকিম (৪৭) বলেন, তাঁর তিন ছেলেমেয়ের মধ্যে ফাহিম সবার বড়। অন্য দুজন রিদুয়ানের বয়স ছয় ও জান্নাতের চার বছর। তিন সন্তানকে পাশের নুরানি মাদ্রাসায় পড়তে দেন। চার বছর বয়সে মক্তবে (মাদ্রাসা) যাওয়ার সময় হঠাৎ ফাহিমের প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া শুরু হয়। পরে টেকনাফ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা করানো হয়। চিকিৎসকের পরামর্শে ছেলেকে নেওয়া হয় কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন হাসপাতালে। সেখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসক জানান, ফাহিমের লিভার ও কিডনিতে সংক্রমণ ঘটেছে। এর পর থেকে বন্ধ তার লেখাপড়া।
আমির হাকিম বলেন, ছেলেকে সুস্থ করতে প্রথমে ভিটেমাটি বিক্রি করা হয়, তারপর আয়-রোজগারের একমাত্র অবলম্বন টমটম গাড়ি বিক্রি করে কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা করানো হয়। কিন্তু ছেলেকে সুস্থ করা যাচ্ছে না। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, ঢাকার বড় কোনো হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা করালে ছেলে ভালো হয়ে যাবে। তাতে দরকার ৫-৬ লাখ টাকা। সেই টাকা তাঁর নেই।
ওষুধ বন্ধ হলেই ফাহিমের শরীর ফুলে যায়, প্রস্রাব বন্ধ হলে জ্বালাপোড়া শুরু হয়, তখন কান্নাকাটি করে সে। আমির হাকিম বলেন, সর্বশেষ গত জানুয়ারি মাসে গণচাঁদা তুলে ২১ হাজার টাকা সংগ্রহ করেছিলেন। সেই টাকায় কক্সবাজারের একটি হাসপাতালে ছেলের চিকিৎসা করা হয়। কিন্তু ছেলের প্রস্রাবের জ্বালাপোড়া থামছে না। ঢাকায় নিয়ে চিকিৎসা করতে তাঁরা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদের সহযোগিতা চান।
ফাহিমের চিকিৎসা করেছিলেন টেকনাফ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের তৎকালীন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা প্রণয় রুদ্র। তিনি বলেন, শিশুটির লিভার ও কিডনিতে জটিলতা রয়েছে। সময়মতো উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বর্তমানে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের মেডিসিন ও নেফ্রোলজি বিভাগের একজন সহযোগী অধ্যাপকের ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী ফাহিমকে ওষুধ খাওয়ানো হচ্ছে বলে জানান ফাহিমের বাবা।