কলেজের পোশাকে দুজনে পা বাড়িয়েছিল অজানার পথে, দুর্ঘটনায় বদলে গেল গল্প

ট্রেনপ্রতীকী ছবি

ছেলেটির বাড়ি উত্তরাঞ্চলে। মেয়েটির দক্ষিণাঞ্চলে। দুজনের পরিবারই ঢাকায় থাকে। একই কলেজে একাদশ শ্রেণিতে পড়ে তারা। দুজনের গায়েই ছিল কলেজের সাদা পোশাক। পরিবারের আপত্তির কারণে তারা অজানার পথে পা বাড়িয়েছিল। তাদের যখন রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসা হলো, ততক্ষণে আহত মেয়েটির সাদা ইউনিফর্মের একাংশ ভিজে লাল হয়ে গেছে।

সোমবার বিকেল ৫টায় পাবনার মাঝগ্রাম রেলস্টেশনে দুর্ঘটনার শিকার হয় তারা। ঢাকা-চাঁপাইনবাবগঞ্জের বনলতা এক্সপ্রেস ট্রেনের যাত্রী ছিল তারা। মাঝগ্রাম স্টেশনে ট্রেন থেকে নামতে গিয়ে দুর্ঘটনায় আহত মেয়েটিকে আবার সেই বনলতা এক্সপ্রেসেই রাজশাহী নিয়ে আসা হয়। রাত আটটার দিকে তাকে ভর্তি করা হয় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের অর্থোপেডিকস সার্জারি বিভাগের ৩১ নম্বর ওয়ার্ডে। এখন অজানার পথ থেকে বাড়ি ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছে অপ্রাপ্তবয়স্ক এই দুই কলেজশিক্ষার্থী।

দুর্ঘটনার পর ছেলে ও মেয়েটির পাশে দাঁড়িয়েছিলেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের বাসিন্দা অনিক আলী। তিনিও বনলতা এক্সপ্রেসের যাত্রী ছিলেন। দুর্ঘটনার পর মেয়েটির সঙ্গে শুধু ছেলেটিকেই দেখতে পান। তাদের সঙ্গে আর কেউ নেই বুঝতে পেরে সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসেন।

অনিক আলী প্রথম আলোকে বলেন, ঢাকার কমলাপুরে গিয়ে ট্রেন চিনতে পারেনি ওই দুজন। চাঁপাইনবাবগঞ্জগামী বনলতা এক্সপ্রেসেই উঠে বসে। পাবনায় আসার পর তারা জানতে পারে, ট্রেনটি রাজশাহীর দিকে যাচ্ছে। তখনই সিদ্ধান্ত নেয়, নেমে যাবে।

মাঝগ্রাম স্টেশনে ট্রেন থামতেই ছেলেটি আগে নেমে যায়, এরপর মেয়েটি; কিন্তু তার পা প্ল্যাটফর্মে পড়ার আগেই ট্রেন চলতে শুরু করে। একমুহূর্তেই পরিস্থিতি বদলে যায়।

মেয়েটি ট্রেন ও প্ল্যাটফর্মের মাঝামাঝি জায়গায় ঢুকে যায়। আর ঠিক তখনই ছেলেটি তার হাত ধরে ফেলে। আরেকটু দেরি হলেই হয়তো গল্পটি অন্য রকম হতো; কিন্তু ছেলেটির সতর্কতায় অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যায় সে। এরপর ট্রেনটি থামলে আহত মেয়েটিকে ওই ট্রেনে করে রাজশাহী নিয়ে আসা হয়।

রাতে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, ট্রলিতে তখনো মেয়েটির পরনে কলেজের সাদা পোশাক। মাথায় ব্যান্ডেজ। হাত থেকে রক্ত ঝরছে। সেই রক্তে সাদা পোশাকের একাংশ লাল হয়ে গেছে।

চারপাশে হাসপাতালের ব্যস্ততা। ভিড়ের মধ্যে কলেজের পোশাক পরা ছেলেটি নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মুঠোফোনে একটির পর একটি কল আসছে। কী করবে, কোথায় যাবে—কিছুই যেন বুঝে উঠতে পারছে না।

চিকিৎসক মেয়েটির হাতের এক্স-রে এবং মাথার সিটি স্ক্যান করতে বলেছেন। হাসপাতালের ভেতরেই এসব পরীক্ষা করার ব্যবস্থা রয়েছে; কিন্তু তাদের অসহায় অবস্থার সুযোগ নিতে রোগী ধরার দালালেরা বাইরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। পরে হাসপাতালেই পরীক্ষা করার ব্যবস্থা রয়েছে জানানো হলে মেয়েটিকে সেখানে নেওয়া হয়।

ছেলেটির সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, তার বাড়ি উত্তরাঞ্চলের একটি জেলায়। মেয়েটির বাড়ি দক্ষিণাঞ্চলে। দুজনের পরিবারই ঢাকায় থাকে। একই কলেজে একাদশ শ্রেণিতে পড়ে তারা। কলেজেই তাদের প্রথম পরিচয়। সেই পরিচয় ধীরে ধীরে গড়িয়েছে ভালো লাগায়। তারপর মন দেওয়া-নেওয়া; কিন্তু সম্পর্কের কথা পরিবার জেনে যাওয়ার পরই শুরু হয় বিপত্তি।

পরিবার তাদের এই সম্পর্ক মেনে নেবে না—এই কথা মুখে বলতে পারেনি মেয়েটি। তাই সকালে চিঠিতে লিখে দিয়েছিল সব কথা। তারপর দুজন বেরিয়ে পড়ে অজানার পথে। একপর্যায়ে গন্তব্য ঠিক হয় জয়পুরহাট। সেখানে ছেলেটির এক দাদার বাড়ি। সেখানে গিয়ে বিয়ে করার পরিকল্পনার কথাও জানায় ছেলেটি।

রাতে আবার ছেলেটির সঙ্গে ফোনে কথা হয়। ততক্ষণে এক্স-রে ও সিটি স্ক্যানের রিপোর্ট চিকিৎসক দেখেছেন। ছেলেটি জানায়, মেয়েটির বাঁ হাত ভেঙে গেছে। মাথায় গুরুতর আঘাত রয়েছে। রাজশাহীতে তাদের কেউ নেই। তাই ছেলেটির সিদ্ধান্ত—মেয়েটিকে নিয়ে আবার ঢাকায় ফিরবে।