ধর্ষণের অভিযোগ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি নারীর নিরাপত্তায় পুলিশ

প্রতীকী ছবি

নোয়াখালীর হাতিয়ায় এক নারীকে (৩২) ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। ওই নারীর অভিযোগ, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে বিরোধ থেকে তিনি ধর্ষণের শিকার হয়েছেন।

গতকাল শনিবার বিকেলে জেলা সদরের ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হন ওই নারী। সেখানে নারী পুলিশ সদস্যদের পাহারায় তাঁর চিকিৎসা চলছে। ঘটনাটি গত শুক্রবার রাতের বলা হলেও আজ রোববার পর্যন্ত থানায় মামলা হয়নি।

হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক চিকিৎসক মোহাম্মদ ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ধর্ষণের অভিযোগ নিয়ে তিন সন্তানের এই জননী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর নিয়ম অনুযায়ী একজন নারী চিকিৎসককে দিয়ে প্রয়োজনীয় আলামত সংগ্রহ করে তা সংরক্ষণ করা হয়েছে। পুলিশের লিখিত চাহিদাপত্রের আলোকে আলামত পরীক্ষার জন্য নোয়াখালী মেডিকেল কলেজের পরীক্ষাগারে পাঠানো হবে।

ওই নারীর পক্ষ থেকে থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ করা হয়নি বলে জানান হাতিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, অভিযোগ পাওয়ার পর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাসহ থানা-পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। পরিদর্শনকালে হামলা-ভাঙচুরের সত্যতা পাওয়া গেলেও ধর্ষণের বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে ওই নারী লিখিত অভিযোগ দিলে তা মামলা হিসেবে গ্রহণে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

হাসপাতালে ওই নারী অভিযোগ করেন, শুক্রবার রাত ১১টার দিকে হঠাৎ ঘরের দরজায় লাথির আওয়াজ হয়। তখন তিনি দরজা খুলতেই একই এলাকার তিন ব্যক্তি ঘরে ঢুকেই বলে, ‘এনসিপি কইরচস? এনসিপির স্বাদ আজকে দেখাচ্ছি।’ এরপর তাঁর স্বামীকে একটি কক্ষে আটকে রেখে তাঁকে ধর্ষণ করা হয়।

ওই নারী যাঁর বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ করেছেন, সেই ব্যক্তি অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। প্রথম আলোর কাছে তিনি দাবি করেছেন যে ওই রাতে এলাকায় মারামারির ঘটনায় এনসিপির কর্মীদের হামলায় তিনি আহত হয়ে হাসপাতালে যান। হাসপাতালের জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নেওয়ার প্রমাণও দেখান তিনি।

নারীর অভিযোগ নিয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য আলোচনায় আসায় আজ দুপুরে ঘটনাটি সম্পর্কে খোঁজ নিতে সরেজমিনে ওই এলাকায় দেখা যায়, সরকারি পাকা আশ্রয়ণ প্রকল্পের একটি ব্যারাকে স্বামী-সন্তান নিয়ে থাকেন ওই নারী। প্রতিটি ব্যারাকে পাঁচটি পরিবার থাকে। ওই নারীর ঘরটি লম্বালম্বি ব্যারাকের এক মাথায়। ওই ভবনের পাশেই পাকা দুটি টয়লেট ও মাঝখানে গোসলখানা। নারীর ঘরের দরজা ও বেড়া ভাঙা এবং ধারালো অস্ত্রে কাটা। তবে ঘরে কাউকে পাওয়া যায়নি।

নির্যাতনের শিকার নারী আজ বিকেলে হাসপাতালে প্রথম আলোকে বলেন, আজ রাতে তাঁর স্বামীর হাসপাতালে আসার কথা রয়েছে। স্বামী না এলে প্রয়োজনে তিনি নিজেই বাদী হয়ে মামলা করবেন। এ সময় নারীর পাশে বসা পুলিশের নারী কনস্টেবলরা জানান, তাঁরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে আজ সকাল থেকে হাসপাতালে তাঁর নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছেন।

গতকাল রাত ১২টার দিকে নির্যাতনের শিকার নারীকে দেখতে হাসপাতালে যান নোয়াখালী-৬ (হাতিয়া) আসনে এনসিপি থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য আবদুল হান্নান মাসউদ এবং জেলা জামায়াতের আমির ইসহাক খন্দকার। তাঁরা জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের সঙ্গে ভিডিও কলে তাঁর কথা বলিয়ে দেন।

পরে হাসপাতালে উপস্থিত সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন হান্নান মাসউদ। তিনি নারীর উদ্ধৃতি দিয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ওনাকে ধর্ষণ করা হয়েছে। ওনার ঘরবাড়িতে হামলা-লুটপাট করা হয়েছে। ওনার স্বামী-সন্তানদের আটকে রেখে ওনাকে ধর্ষণ করা হয়েছে। হাসপাতালের মেডিক্যাল টিমের কাজ করার কথা ছিল, পুলিশ এসে ওনার জবানবন্দি নেওয়ার কথা ছিল, এখন পর্যন্ত পুলিশ জবানবন্দি নেয়নি।

হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী জানান, হাসপাতালের রেজিস্ট্রার অনুযায়ী ওই নারী গতকাল বেলা ১টা ৫০ মিনিটে মারধরের অভিযোগ নিয়ে প্রথমে হাসপাতালের জরুরি বিভাগ থেকে চিকিৎসা নেন। পরে বিকেল ৫টা ৫ মিনিটে দ্বিতীয়বার এসে তিনি আগের দিন রাত ১১টায় ধর্ষণের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করেন। আবার একই হাসপাতালের জরুরি বিভাগ থেকে আগের দিন (শুক্রবার) রাত সাড়ে ১০টায় কপালে আঘাতের চিকিৎসা নেন এক ব্যক্তি। ওই ব্যক্তি আর নারীকে নির্যাতনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি একই লোক কি না, পুলিশ চাইলে হাসপাতালের সিসিটিভির ফুটেজ পরীক্ষা করে বের করতে পারে।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অর্থ ও প্রশাসন) আবু তৈয়ব মো. আরিফ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, নারী নির্যাতনের শিকার হওয়ার বিষয়টি বিভিন্ন মাধ্যমে আসার পর পুলিশ এ নিয়ে তদন্ত শুরু করে। হাসপাতালে ওই নারীর নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তিনি লিখিত অভিযোগ দিলে তদন্ত করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে নির্যাতনের শিকার নারীর সঙ্গে আজ দুপুরে মুঠোফোনে কথা বলেছেন সরকারের দুই উপদেষ্টা। তাঁরা হলেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন, তথ্য ও সম্প্রচার এবং পানিসম্পদ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আকতার। তাঁরা তাঁর খোঁজখবর নেন এবং আইনি সহায়তার আশ্বাস দেন।