গোদাগাড়ীর ঝালপুকুরের চড়কমেলায় আজও সাঁওতাল যুবকেরা খোঁজেন জীবনসঙ্গিনী

রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার পাকুড় ইউনিয়নের ঝালপুকুড় গ্রামে চড়কমেলা। বুধবার বিকেলেছবি: প্রথম আলো

চড়কমেলায় আনন্দ–উল্লাসে মাতল রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার পাকুড় ইউনিয়নের ঝালপুকুড় গ্রামের ক্ষুদ্র জাতিসত্তার কুড়মি মাহাতো জনগোষ্ঠীর মানুষেরা। বট-পাকুড় ও বাঁশবাগানের ছায়ায় ঘেরা স্থানে ঝালপুকুরে এ মেলা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সন্ধ্যার আগে চড়ক ঘুরিয়ে শেষ হয় মেলা। তবে পিঠে বড়শি বিঁধিয়ে নয়, কোমরে দড়ি ও গামছা বেঁধে চড়ক ঘোরানো হয়। পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে বসে এ গ্রামীণ মেলা।

কুড়মি মাহাতো জনগোষ্ঠীর লোকজন জানান, পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে কয়েক শ বছর থেকে এ গ্রামীণ মেলার আয়োজন করে আসছেন তাঁরা। এ মেলা মাহাতোরা আয়োজন করলেও এ মেলায় আগত মানুষদের সাঁওতাল নারী-পুরুষের সংখ্যাই বেশি। এ সাঁওতাল তরুণী-যুবতীরা সেজেগুজে আসেন। এর মধ্যে থেকে যুবকেরা তাঁদের জীবন সঙ্গিনীরও খোঁজ করেন। এটাই এ মেলার বিশেষ বৈশিষ্ট্য। মেলায় আসা যুবকদের অনেকেই এখন বিষয়টি স্বীকার না করলেও কেউ কেউ করেন।

পড়ন্ত বিকেলে চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোলের বেচন্দা গ্রাম থেকে আসা একদল যুবকের সঙ্গে দেখা হয় প্রতিবেদকের। তাঁরা মোটামুটি লেখাপড়া করেছেন। তাঁদের মধ্যে ফিলিপ মুরমু ও সুনীল মুরমুর কাছে বিয়ের পাত্রী খোঁজার বিষয়টি জানার চেষ্টা করা হলে তাঁরা লাজুক হেসে বিষয়টি এড়িয়ে যান। কিন্তু বিবাহিত যুবক জয় সরেন (২৪) প্রথম আলোকে বলেন, ‘ওরা লজ্জায় বলছে না। আমরা গ্রামে ২০ জন যুবক দল বেঁধে মেলায় এসেছি। বেশির পছন্দের পাত্রী পেলে তাঁকে প্রস্তাব দেবে। এরপর পারিবারিকভাবে বিয়ে। এ ক্ষেত্রে বেশির ভাগ ছেলের পরিবার ছেলের পছন্দকে মেনে নেয়। তবে সবাই এ জন্যই মেলায় আসে, তা নয়। আনন্দ করার জন্য সমবয়সী সাঁওতাল নারী-মেলায় আসেন। মিঠাই-মন্ডা খান। বাড়ির জন্য কিনে নিয়ে যান। এ ছাড়া মেলা থেকে শাখা, পলা, চুড়ি, ফিতা ও ইমিটেশনের গহনা কিনে নিয়ে যায়।’

ঝালপুকুরের চড়ক মেলার ঐতিহ্য তুলে ধরলেন গ্রামের গণেশ মাহাতো (৭৮)। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, তাঁর বাবা-দাদারাও বলতে পারেননি ঠিক কবে থেকে মাহাতোদের আয়োজনে এই মেলা হয়ে আসছে। চৈত্রসংক্রান্তির রাতে চড়কপূজা হতো। চাঁদের আলোয় রাতজুড়ে মাদল-বাঁশির তালে তালে আদিবাসী মেয়েরা নাচগান করতেন। সকালের লাল সূর্যের মিষ্টি আভায় চড়ক ঘুরিয়ে মেলা শেষ করা হতো। মেলা থেকে মানুষ কিনে নিয়ে যেত মিঠাই, মণ্ডা, শিশুদের খেলনা। মেয়েরা নিত চুড়ি-ফিতা, আলতা-সিঁদুর, শাখা-পলা, দা-বঁটিসহ নানা প্রয়োজনীয় জিনিস। তবে স্বাধীনতার পর থেকে রাতে আর মেলা বসে না।

গণেশ মাহাতো আক্ষেপ করে আরও বলেন, যখন থেকে রাতের মেলা বন্ধ হলো, তখন থেকে রাতভর নাচ-গানের আনন্দ থেকে বঞ্চিত হলো মেলায় আসা মানুষেরা। এরপর চড়কা ঘোরানোর আগে সাঁওতালদের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক দল এসে নাচ-গান করত। কয়েক বছর থেকে তা-ও বন্ধ গেছে। আগের ঐতিহ্য হারিয়ে গেছে এ মেলার। তবে এখনো সাঁওতাল মেয়েরা সেজেগুজে মেলায় আসে। সাঁওতাল যুবকেরা আসে কনে খুঁজতে। কেউ পান, কেউ পান না। তবে এগুলো জানা যায় না, গোপনেই থাকে। পারিবারিকভাবে বিয়ে হয়। সাঁওতাল যুবকদের মেলায় এসে বিয়ের জন্য কনে খোঁজার এই বিশেষত্বটুকু টিকে আছে আজও।