কক্সবাজারের পোপা শুঁটকি রপ্তানি হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, হংকং ও চীনে, কেন এত চাহিদা

পোপা শুঁটকির কারখানায় কাজে ব্যস্ত নারী শ্রমিকেরা। সম্প্রতি কক্সবাজারের উত্তর নুনিয়াছটায় ‘সাগর ফিশ এক্সপোর্ট’ কারখানায়ছবি: প্রথম আলো

কক্সবাজার উপকূলে উৎপাদিত পোপা শুঁটকি রপ্তানি হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, হংকং ও চীনে। পোপা শুঁটকি দিয়ে তৈরি সুস্বাদু স্যুপ ও খাদ্যের চাহিদা রয়েছে সেসব দেশে। এ ছাড়া পোপা মাছের শুকনা পটকা (বায়ুথলি) ও আঁইশ কোলাজেন তৈরিতে ব্যবহৃত হয়—প্রসাধন ও ওষুধশিল্পে যার ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। গত বছর শহরের উত্তর নুনিয়াছটার একটি কারখানা (ফিশ ফ্যাক্টরি) থেকে ৬ কোটি টাকা দামের ৭০ মেট্রিক টন পোপা শুঁটকি তিন দেশে রপ্তানি হয়েছে। চলতি বছর রপ্তানি হওয়ার কথা রয়েছে ৮০ মেট্রিক টনের মতো। তবে কয়েক মাস ধরে মাছ আহরণ কমে যাওয়ায় রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে কি না, সে আশঙ্কাও রয়েছে।

দেশের সর্ববৃহৎ শুঁটকি উৎপাদনের মহালটি গড়ে উঠেছে কক্সবাজার পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের নাজিরাটেক উপকূলে। এক যুগ ধরে এখানে শুঁটকি উৎপাদনের প্রায় ৭০০টি মহাল গড়ে উঠেছে। গত বছর মহালগুলোতে অন্তত ৩০০ কোটি টাকার শুঁটকি উৎপাদিত হয়েছে। সমুদ্র থেকে ধরে আনা লাক্ষা, মাইট্যা, পোপা, লইট্যা, কোরাল, চাপা, কামিলা, ফাইস্যাসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ রোদে শুকিয়ে শুঁটকি করা হয়। তবে পোপা মাছের শুঁটকি তৈরির প্রক্রিয়া অন্য শুঁটকির চেয়ে আলাদা। কক্সবাজার সামুদ্রিক মৎস্য উৎপাদন ও ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মো. জয়নাল আবেদীন বলেন, বিদেশে রপ্তানিযোগ্য পোপা শুঁটকি উৎপাদন করতে হয় বিশেষ পদ্ধতিতে। মানসম্পন্ন না হলে এই শুঁটকি রপ্তানির জন্য অযোগ্য ঘোষিত হয়। বিদেশি ক্রেতারা (বায়ার) কারখানায় উপস্থিত থেকেই শুঁটকির গুণমান তদারক করেন।

পোপা শুঁটকির কারখানা আলাদা

পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের উত্তর নুনিয়াছটা উপকূলে রয়েছে পোপা শুঁটকির রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ‘সাগর ফিশ এক্সপোর্ট’। সম্প্রতি সেখানে গিয়ে দেখা গেছে, সবুজ পোশাক পরিহিত কয়েকজন নারী বাঁশের মাচায় পোপা শুঁটকির পরিচর্যা করছেন। কয়েকজন শ্রমিক সমুদ্র থেকে ধরে আনা কাঁচা পোপা মাছের পেটে ভরে রাখা লবণ, নাড়িভুঁড়ি বের করে ধুয়ে–মুছে পরিষ্কার করছেন। কয়েকজন শ্রমিক সেই মাছ রোদে শুকাতে দিচ্ছেন। সাগর ফিশ এক্সপোর্টের মালিক আবিদ আহসান ঘুরে ঘুরে শুঁটকি তদারকি করছেন।

কক্সবাজারের চেম্বারের পরিচালক আবিদ আহসান প্রথম আলোকে বলেন, রাত-দিন ২৪ ঘণ্টা কারখানায় পোপা শুঁটকির উৎপাদন চলে। সেখানে শ্রমিক আছেন ৩০ জন। বিদেশে রপ্তানির পোপা মাছ গভীর সাগর থেকে ধরে আনা হয়। অধিকাংশ পোপা ধরা হয় বড়শি দিয়ে। বড়শি দিয়ে পোপা মাছ ধরার ট্রলার আছে ১২০টির বেশি। এর মধ্যে মহেশখালী, ঘটিভাঙ্গা, সোনাদিয়া, চৌফলদণ্ডীর ২৮টি ট্রলার তাঁর কারখানায় নিয়মিত পোপা সরবরাহ করে। তিনি জানান, জমিসহ কারখানার বিপরীতে তাঁর বিনিয়োগ প্রায় ১৫ কোটি টাকা।

সকালে কারখানায় কয়েক মণ পোপা মাছ নিয়ে আসেন মহেশখালীর ঘটিভাঙ্গার একটি ট্রলারের কয়েকজন জেলে। মাছগুলোর ৮০ শতাংশের ওজন ৪০০-৫০০ গ্রাম। প্রতি কেজি পোপার পাইকারি দাম ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা। এর মধ্যে বরফে সংরক্ষিত পোপা মাছ ৩০০ টাকা, আর লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করা পোপার দাম ৪০০ টাকা। সাগরে মাছ ধরার পর জেলেরা এখন বরফের পরিবর্তে পোপা মাছের পেটে লবণ ঢুকিয়ে রাখেন, তাতে মাছ দ্রুত পচে যায় না।

শুঁটকি তৈরির সময় পোয়া মাছের গুণগত মান কঠোরভাবে রক্ষা করতে হয়। নয়তো রপ্তানি আদেশ বাতিল হয়ে যায়
ছবি: প্রথম আলো

কমছে পোপা মাছ

সাগরে পোপা মাছ কম ধরা পড়ছে এখন। মাছ ধরার ট্রলারের মাঝি (সারেং) আবদুল নবী বলেন, উপকূল থেকে ৬০-৭০ কিলোমিটার দূরে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে বড়শি ফেলতে হয়। প্রতিটি লাইনারে (রশিতে) তিন-চার হাজার করে বড়শি থাকে। বড়শি সাগরের তলায় চলে যায়। ভাটার সময় বড়শিতে আধার (মাছের খাদ্য) গেঁথে পানিতে ফেলা হয়। ছয় ঘণ্টা পর জোয়ার শুরু হলে পোপা মাছ সে খাদ্য খেতে আসে। এভাবে সাত-আট দিন সাগরে অবস্থান করে পোপা মাছ ধরা হয়। গত বছর এই ট্রলারের জেলেরা ১৫ লাখ টাকার পোপা মাছ ধরেছেন। তবে চলতি মৌসুমে তেমন মাছ ধরা পড়ছে না। গত আট মাসে সাত লাখ টাকার পোপ বিক্রি করেছেন তাঁরা।

আরেকটি ট্রলারের জেলে শামসুল আলম বলেন, কয়েক বছর আগেও সাগরে ১৮ প্রজাতির পোপা ধরা পড়ত, এখন ১২ জাতের পোপা ধরা পড়ছে। এর মধ্যে বেশি দামে বিক্রি হয় কালো জাতের পোপা। আগে ট্রলারে বরফের মাধ্যমে আহরিত পোপা সংরক্ষণ করা হতো। এখন পোপা মাছের পেট কেটে লবণ ঢুকিয়ে সংরক্ষণ করতে হয়। কারণ, নিম্নমানের বরফ দিয়ে পোপা সংরক্ষণ করলে শুঁটকির গুণমান নষ্ট হয়ে যায়, রপ্তানির অযোগ্য হয়ে পড়ে।

পোপা মাছের শুঁটকি তৈরির প্রক্রিয়া অন্য শুঁটকির চেয়ে আলাদা। কক্সবাজার সামুদ্রিক মৎস্য উৎপাদন ও ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মো. জয়নাল আবেদীন বলেন, বিদেশে রপ্তানিযোগ্য পোপা শুঁটকি উৎপাদন করতে হয় বিশেষ পদ্ধতিতে। মানসম্পন্ন না হলে এই শুঁটকি রপ্তানির জন্য অযোগ্য ঘোষিত হয়। বিদেশি ক্রেতারা (বায়ার) কারখানায় উপস্থিত থেকেই শুঁটকির গুণমান তদারক করেন।

আরও কয়েকটি ট্রলারের জেলেরা জানান, গভীর সাগরে মিয়ানমার ও ভারতের বহু ট্রলিং জাহাজকে মাছ ধরতে দেখা যায়। চট্টগ্রামের অসংখ্য ট্রলিং জাহাজ কক্সবাজার উপকূলে এসে মাছ ধরে। জাহাজগুলো জাল টেনে সাগরতলের সব প্রজাতির মাছ আহরণ করে। ট্রলিং জাহাজের কারণে কক্সবাজারের কাঠের ট্রলারগুলো সাগরে জাল ফেলতে পারে না। ট্রলিং জাহাজের নির্বিচার মাছ ধরার কারণে সাগর মাছশূন্য হয়ে পড়ছে।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. নাজমুল হুদা বলেন, গভীর সাগরে গিয়ে ট্রলিং জাহাজের নির্বিচার মাছ আহরণ তদারকি করার মতো আধুনিক জলযান তাঁর দপ্তরের নেই। তবে কোস্টগার্ড, নৌবাহিনী ও নৌ পুলিশের সহযোগিতায় মৎস্য অধিদপ্তর নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল, বিহিন্দি জালের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে।

কক্সবাজার শহরের উত্তর নুনিয়াছটার একটি কারখানায় রপ্তানির জন্য পোপা শুঁটকি প্যাকেটজাত করা হচ্ছে। সম্প্রতি তোলা
ছবি: প্রথম আলো

যেভাবে শুঁটকি তৈরি হয়

সম্প্রতি পোপা তৈরির কারাখানা সাগর ফিশ এক্সপোর্টে গিয়ে শুঁটকি তৈরির খুঁটিনাটি দেখা হলো। কারখানায় পোপা মাছ আনার পর শ্রমিকেরা প্রথমে পেট থেকে লবণ বের করে নেন। তারপর নাড়িভুঁড়ি ফেলে দিয়ে ওয়াশিং ট্যাংকে রাখা হয়। কারখানায় ট্যাংক আছে ছয়টি। এরপর খোলা মাঠের বাঁশের মাচায় রোদে শুকাতে দেওয়া হয়। বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত চারবার মাছগুলো উল্টেপাল্টে দেওয়া হয়, যেন মাছের সবদিক ঠিকমতো শুকিয়ে যায়। পুরো মাত্রায় শুঁটকি করতে তিন-চার দিন লেগে যায়। এরপর গ্রেড অনুযায়ী প্যাকেজিং করা হয়। তারপর ৫-১০ ডিগ্রি টেম্পারেচারে কোল্ড স্টোরেজে রাখা হয়। সেখান থেকে কার্টনে ভরে শিপমেন্টের জন্য চট্টগ্রাম বন্দরে পাঠানো হয়। প্রসেসিংয়ে গোলমাল হলে পোপা মাছ রপ্তানির অযোগ্য ঘোষিত হয়। তখন লোকসান গুনতে হয়। পোপা শুঁটকি উৎপাদকালে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি (বায়ার) উপস্থিত থেকে মাছের গুণমান তদারক করেন। পোপা শুঁটকির ৩২টি গ্রেড থাকে। গুণমান বিবেচনা করে গ্রেড নির্ধারণ করা হয়।

কারখানার মালিক আবিদ আহসান সাগর বলেন, তিন কেজি কাঁচা পোপা শুঁটকি করলে পাওয়া যায় ১ কেজির মতো। এক মণে শুঁটকি পাওয়া যায় ১৬ কেজি। গত বছর তিনি যুক্তরাষ্ট্র, হংকং ও চীনের ৬টি প্রতিষ্ঠানে ৭০ মেট্রিক টন পোপা শুঁটকি রপ্তানি করেছেন, যার উৎপাদন খরচ গেছে ৬ কোটি টাকা। আর চলতি বছরের ৮ মাসে রপ্তানি করেছেন ৩০ মেট্রিক টন। সাগরে মাছ আহরণ কমে যাওয়ায় উৎপাদনও কমে গেছে। তাতে রপ্তানিও কমে যাচ্ছে।

আবিদ আহসান আরও বলেন, বিদেশে পোপা শুঁটকির চাহিদা অনেক, কিন্তু মাছের সংকট থাকায় রপ্তানি কমে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, হংকং ও চীনে প্রতি কেজি পোপা শুঁটকির বর্তমান দাম ৮ ডলার। আগে ছিল ১২ ডলার। পোপা শুঁটকির দাম সোনার মতো প্রতিদিন ওঠানামা করে।

বিদেশে পোপা শুঁটকির পাশাপাশি এর আঁইশ ও পটকারও চাহিদা রয়েছে। ব্যবসায়ী আবিদ আহসান বলেন, পোপা শুঁটকি দিয়ে সুস্বাদু স্যুপ তৈরি হয়। বিদেশের হোটেল-রেস্তোরাঁয় নারী-পুরুষদের পোপা শুঁটকির স্যুপ খেতে দেখা যায়। চীনে পোপা শুঁটকি দিয়ে দামি ওষুধ তৈরি হয়। চিকিৎসকেরা পোপা শুঁটকি দিয়ে তৈরি ওষুধকে ‘ন্যাচারাল মেডিসিন’ বলে থাকেন। এ ছাড়া এই মাছ থেকে পাওয়া কোলাজেন দিয়ে তৈরি হয় দামি প্রসাধনী।

পোপা থেকে এত কিছু

বিদেশে পোপা শুঁটকির পাশাপাশি এর আঁইশ ও পটকারও চাহিদা রয়েছে। ব্যবসায়ী আবিদ আহসান বলেন, পোপা শুঁটকি দিয়ে সুস্বাদু স্যুপ তৈরি হয়। বিদেশের হোটেল-রেস্তোরাঁয় নারী-পুরুষদের পোপা শুঁটকির স্যুপ খেতে দেখা যায়। চীনে পোপা শুঁটকি দিয়ে দামি ওষুধ তৈরি হয়। চিকিৎসকেরা পোপা শুঁটকি দিয়ে তৈরি ওষুধকে ‘ন্যাচারাল মেডিসিন’ বলে থাকেন। এ ছাড়া এই মাছ থেকে পাওয়া কোলাজেন দিয়ে তৈরি হয় দামি প্রসাধনী।

কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সাবেক সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী বলেন, এক দশক আগেও কক্সবাজারের সেন্ট মার্টিন, টেকনাফ, মহেশখালী ও উত্তর নুনিয়াছটা এলাকায় পোপা শুঁটকি উৎপাদনের ২৭টি কারখানা ছিল। মাছের সংকট, লোকসান, সহজ শর্তে ঋণের সুযোগ এবং সরকারি প্রণোদনা না থাকায় ২৪টির বেশি কারখানায় পোপা শুঁটকির উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, অপরিকল্পিতভাবে মৎস্য আহরণ, নিষিদ্ধ জালে মৎস্য আহরণ বৃদ্ধির কারণে সাগরে ইলিশের পাশাপাশি পোপা মাছের আহরণ কমে গেছে বলে অভিমত মৎস্যবিশেষজ্ঞদের।