রাতের খাবার খেয়ে ঘুমিয়েছিলেন, সকালে ডায়ারিয়ায় নারীর মৃত্যু, পরিবারের চারজন হাসপাতালে

মরদেহপ্রতীকী ছবি

কয়রা নদীর তীরের শ্মশানঘাটে তখন শেষকৃত্যের আয়োজন চলছে। পাশে পুরোনো বটগাছের ছায়ায় বসে আছেন স্বজনেরা। কারও চোখে অশ্রু, কারও মুখে নিস্তব্ধতা। আকস্মিক মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না কেউই।

আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে খুলনার কয়রা উপজেলার মহারাজপুর ইউনিয়নের মঠবাড়ি গ্রামের কয়রা নদীর তীরের শ্মশানঘাটে গিয়ে এমন দৃশ্য দেখা যায়। সৎকার করা হচ্ছিল লতিকা সানা (৫৫) নামের এক নারীর মরদেহ। আগের দিন অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে নেওয়ার পর তাঁর মৃত্যু হয়। একই ঘটনায় পরিবারের আরও চার সদস্য অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন।

স্বজনদের ভাষ্য, গত মঙ্গলবার রাতে বাজার থেকে কেনা আম ও বাড়িতে থাকা দুধ দিয়ে ভাত খেয়ে পরিবারের সদস্যরা ঘুমিয়ে পড়েন। ভোরের দিকে তাঁদের পেট খারাপ শুরু হয়। পরে ডায়রিয়া দেখা দেয়। অবস্থার অবনতি হলে গতকাল বুধবার বিকেলে তাঁদের কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকেরা লতিকা সানাকে মৃত ঘোষণা করেন।

অসুস্থ ব্যক্তিরা হলেন তুলসী সানা (৪২), ইন্দ্রজিৎ সানা (১৪), বিবেকানন্দ সানা (৬০) ও প্রকাশ সানা (৫১)।

লতিকা সানার দুই ছেলে কৌশিক সানা ও কল্যাণ সানা চাকরির কারণে ভিন্ন জেলায় থাকেন। মায়ের মৃত্যুসংবাদ পেয়ে আজ সকালে তাঁরা বাড়িতে পৌঁছান। তাঁদের জন্য অপেক্ষা করেই দুপুরে মরদেহ সৎকার করা হয়।

শ্মশানঘাটে দাঁড়িয়ে কথা হয় স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক পঙ্কজ কুমার সানার সঙ্গে। তিনি সম্পর্কে লতিকা সানার দেবর।

পঙ্কজ কুমার সানা বলেন, ‘সকালে স্কুলে যাওয়ার আগে শুনেছিলাম, দাদাদের বাড়ির সবার পেট খারাপ হয়েছে। আমরা ভেবেছিলাম, সাধারণ কোনো সমস্যা। স্থানীয় একজন চিকিৎসকও দেখেছিলেন। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই খবর পাই, তাঁদের অবস্থা আরও খারাপ হচ্ছে। পরে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়। বিষয়টি এতটা গুরুতর হবে, ভাবতে পারিনি।’

লতিকা সানার ভাতিজা নিতিশ সানা বলেন, ‘রাতে আম আর দুধ দিয়ে ভাত খাওয়ার পর সবাই স্বাভাবিকভাবেই ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। ভোরের দিকে যাঁরা ওই খাবার খেয়েছিলেন, তাঁদের সবার ডায়রিয়া শুরু হয়। পরে দুপুরে একজন স্থানীয় চিকিৎসক এসে হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন। আমার জেঠিমার অবস্থা দ্রুত খারাপ হয়ে যায়। হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।’

অসুস্থতার কারণ নিয়ে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে এখনো সংশয় রয়েছে। নিতিশ সানা বলেন, ‘আম খেয়ে নাকি দুধ খেয়ে অসুস্থ হয়েছেন, তা বুঝতে পারছি না। বাজার থেকে তো আরও অনেকে আম কিনেছিলেন। তাঁদের কারও অসুস্থ হওয়ার খবর পাইনি।’
নিতিশ সানা আরও বলেন, ‘আমার সেজ জেঠিমা তুলসী সানার অবস্থা এখনো ভালো নয়। তাঁকে আবার হাসপাতালে নিতে হতে পারে। আজ সকালে চিকিৎসাধীন অন্যদের বাড়িতে নিয়ে আসা হয়েছে।’

শ্মশানে দাঁড়িয়ে ছিলেন তুলসী সানার মেয়ে শ্রেয়া সানা। মায়ের অসুস্থতার খবর পেয়ে খুলনা থেকে ছুটে এসেছেন তিনি। চোখেমুখে শোক আর উৎকণ্ঠার ছাপ। শ্রেয়া বলেন, ‘একই পরিবারের পাঁচজন একসঙ্গে অসুস্থ হয়ে পড়লেন, একজন মারা গেলেন। কেন এমন হলো, তা আমরা এখনো বুঝতে পারছি না।’

কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. সুজিত কুমার বৈদ্য বলেন, ‘ডায়রিয়ায় আক্রান্ত একই পরিবারের পাঁচজনকে গতকাল বিকেলে হাসপাতালে আনা হয়। তাঁদের মধ্যে একজনকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। অন্য চারজনকে ভর্তি করে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, তাঁরা খাদ্যজনিত বিষক্রিয়া বা তীব্র ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে থাকতে পারেন।’