সাতক্ষীরায় শ্লীলতাহানির অভিযোগ তুলে ‘মব’ করে শিক্ষককে পিটিয়ে জখম
সাতক্ষীরা সদর উপজেলায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে সপ্তম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে শ্লীলতাহানির অভিযোগ তুলে মব সৃষ্টি করে পিটিয়ে জখম করার ঘটনা ঘটেছে। গতকাল সোমবার সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত উপজেলার একটি মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এ ঘটে।
ভুক্তভোগী ওই বিদ্যালয়ের গণিতের শিক্ষক। তাঁকে প্রথমে শ্রেণিকক্ষে চড়-থাপ্পড় মারার পর শিক্ষকদের কক্ষে নিয়ে লোহার রড দিয়ে পেটানো হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ও জনরোষ থেকে শিক্ষককে বাঁচাতে পুলিশের কাছে তুলে দেয় বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। লিখিত অভিযোগ না থাকায় রাতে তাঁকে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার জিম্মায় দেওয়া হয়।
আজ মঙ্গলবার সকালে অভিযোগকারী শিক্ষার্থীর বাবার সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানান, ঈদের ছুটির পর গত রোববার বিদ্যালয়ে পাঠদান শুরু হয়। দুপুর ১২টার দিকে সপ্তম শ্রেণিতে গণিতের ক্লাস নেওয়ার সময় ওই শিক্ষক তাঁর মেয়ের সঙ্গে অশোভন আচরণ করেছেন বলে অভিযোগ। বিকেলে বাড়িতে ফিরে মেয়েটি ঘটনাটি তার মাকে জানায়। এরপর তিনি বিষয়টি স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আজগার আলী সরদারকে জানান। তবে তিনি বিষয়টিকে গুরুত্ব দেননি। এ কারণে স্থানীয় লোকজনকে সঙ্গে নিয়ে গতকাল সকাল ১০টার দিকে তিনি বিদ্যালয়ে যান। এ সময় গণিতের ক্লাস চলাকালে তিনি ওই শিক্ষককে কয়েকটি চড় মারেন। পরে স্থানীয় কয়েকজন শিক্ষকদের কক্ষে ঢুকে তাঁকে মারধর করেন। তিনি দাবি করেন, গত বছরও ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে পঞ্চম শ্রেণির এক ছাত্রীকে শ্লীলতাহানির অভিযোগ উঠেছিল। এ ঘটনার পর তিনি তাঁর মেয়েকে অন্যত্র ভর্তি করানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
সপ্তম শ্রেণির অন্তত তিন শিক্ষার্থী জানায়, রোববার শ্রেণিকক্ষে তাদের সহপাঠীর সঙ্গে ওই শিক্ষকের কোনো খারাপ আচরণ করতে তারা দেখেনি। তবে সোমবার পাঠদান চলাকালে এক শিক্ষার্থীর বাবা শ্রেণিকক্ষে ঢুকে ওই শিক্ষককে মারধর করেন।
এ বিষয়ে কথা বলতে ওই শিক্ষকের মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। তাঁর স্ত্রী প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর স্বামীর বিরুদ্ধে করা অভিযোগ মিথ্যা ও ষড়যন্ত্রমূলক। প্রশাসনের কাছে তিনি ন্যায়বিচার প্রার্থনা করেছেন।
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আজগার আলী সরদার বলেন, কোনো শিক্ষক-শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ দেওয়ার সুযোগ আছে। রোববারের ঘটনার বিষয়ে সোমবার সকালে জানার পর তিনি অভিযোগকারী অভিভাবককে বিদ্যালয়ে আসতে বলেন। কিন্তু ওই অভিভাবক শতাধিক লোক নিয়ে বিদ্যালয়ে আসেন। তিনি বলেন, ওই অভিভাবক শ্রেণিকক্ষে গিয়ে ওই শিক্ষককে কয়েকটি চড় মারেন। পরে শিক্ষকদের কক্ষে আসার পর বহিরাগত লোকজন লোহার রড দিয়ে তাঁর মাথায় আঘাত করেন। বিষয়টি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি, উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ও থানার পুলিশকে জানানো হয়। জনরোষ থেকে রক্ষা করতে শিক্ষককে পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়।
সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান বলেন, কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে লিখিতভাবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো উচিত ছিল। অভিযোগের পরিবর্তে বিদ্যালয়ে ঢুকে হামলা চালানো ও মব সৃষ্টি করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এতে শিক্ষার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তিনি বলেন, ওই শিক্ষককে অন্যত্র বদলির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ঘটনাটি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আগরদাঁড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কবীর হোসেন বলেন, ঘটনাটি দুঃখজনক। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ ও শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মর্যাদা বিবেচনায় স্থানীয়ভাবে আলোচনা করে মামলা না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মাসুদুর রহমান বলেন, লিখিত অভিযোগ না পাওয়ায় সোমবার রাতে ওই শিক্ষককে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়।