কক্সবাজারে হাসপাতালের লিফটের নিচে গৃহবধূর লাশ, তদন্তে কমিটি
কক্সবাজার সদর হাসপাতালের বহির্বিভাগে প্রতিদিন চিকিৎসা নেন এক হাজারের বেশি রোগী। এর বাইরে হাসপাতালের ১২টি ওয়ার্ডেও প্রতিদিন প্রায় পাঁচ শতাধিক রোগী ভর্তি থাকেন। ব্যস্ত এই হাসপাতালের লিফটের নিচে তিন দিন ধরে পড়ে থাকার পর গত শনিবার এক গৃহবধূর লাশ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দা ও হাসপাতালের সেবাপ্রার্থীদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে গত রোববার পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
পুলিশ ও হাসপাতাল সূত্র জানায়, উদ্ধার হওয়া লাশটি উখিয়া উপজেলার রাজাপালং ইউনিয়নের দক্ষিণ ডেইলপাড়ার বাসিন্দা নুরুল ইসলামের স্ত্রী কোহিনুর আক্তারের (৩১)। তিনি ৩ মার্চ পাঁচ বছরের অসুস্থ মেয়ে মরিয়মকে নিয়ে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে আসেন। মরিয়মকে হাসপাতালের পঞ্চম তলার শিশু ওয়ার্ডের ২ নম্বর ইউনিটে ভর্তি করা হয়। পরদিন ৪ মার্চ দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে মেয়ের জন্য ওষুধ কিনতে নিচে যাচ্ছেন বলে ওয়ার্ড থেকে বের হন কোহিনুর। এরপর আর তিনি ফিরে আসেননি। তাঁর স্বামী কাতারপ্রবাসী। অনেক খোঁজাখুঁজির পরও সন্ধান না পেয়ে কোহিনুরের শ্বশুর আলী আকবর কক্সবাজার সদর মডেল থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। পরে শনিবার হাসপাতালের লিফটের নিচ থেকে কোহিনুরের লাশ উদ্ধার করা হয়।
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক চিকিৎসক মং টিং নিও বলেন, লিফটের নিচ থেকে দুর্গন্ধ ছড়ানোর বিষয়টি জানতে পেরে হাসপাতালের সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করা হয়। সেখানে দেখা যায়, কালো বোরকা পরা এক নারী চতুর্থ তলায় হাত দিয়ে লিফটের দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করছেন। তখন লিফটটি পঞ্চম তলায় ছিল। ধারণা করা হচ্ছে, লিফট না থাকা অবস্থায় তিনি ভেতরে ঢুকতে গিয়ে নিচে পড়ে যান। এ ঘটনা তদন্তে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। সাত কর্মদিবসের মধ্যে এ কমিটিকে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
ঝুঁকিপূর্ণ লিফট, আতঙ্কে রোগী ও স্বজন
পাঁচতলা ভবনের মাঝামাঝি স্থানে পাশাপাশি দুটি লিফট রয়েছে। একটি লিফট দিয়ে রোগী ও দর্শনার্থীরা ওঠানামা করেন। অন্যটি চিকিৎসক, নার্স ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য সংরক্ষিত। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, এক যুগ আগে গণপূর্ত বিভাগ লিফট দুটি স্থাপন করে। পরে লিফট পরিচালনার জন্য চারজন লিফটম্যানও নিয়োগ দেওয়া হয়। প্রায় পাঁচ বছর আগে সর্বশেষ লিফটগুলো সংস্কার করা হয়।
গতকাল সোমবার সকালে হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, সাধারণ রোগীদের ব্যবহৃত লিফটের সামনে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ জন নারী-পুরুষ লাইনে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চতুর্থ তলায় থাকা এক রোগী বলেন, ‘৪ মার্চ দুপুরে বোরকা পরা এক নারীকে লিফটের দরজা হাত দিয়ে খুলতে দেখেছিলাম। কিছুক্ষণ পর দরজা খুলে গেলে তিনি ভেতরে ঢোকেন। কিন্তু তিনি নিচে পড়ে গেছেন, এটা তখন কেউ বুঝতে পারেনি।’
হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. সেলিম উদ্দিন বলেন, মাসখানেক ধরে একটি লিফটে ত্রুটি দেখা দেয়। হাত দিয়ে টান দিলেই এর দরজা খুলে যায়। লিফট সংস্কারের জন্য গণপূর্ত বিভাগে চিঠিও দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যেই এ দুর্ঘটনা ঘটে গেল।
কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ছমি উদ্দীন বলেন, লিফটে ত্রুটি ছিল। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন হাতে এলে ঘটনাটি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে। এ ঘটনায় অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে।
এদিকে এ ঘটনা তদন্তে গঠিত কমিটির প্রধান করা হয়েছে কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের সহযোগী অধ্যাপক আলী হোসেনকে। জানতে চাইলে কমিটির সদস্য ও হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের প্রধান ইয়াসির আরাফাত বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে এটি দুর্ঘটনা মনে হচ্ছে। তবে মৃত্যুর পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’ কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, তদন্তে কারও গাফিলতি প্রমাণিত হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।