পাহাড়চূড়ার সেই ‘স্বর্গের সিঁড়ি’ এখন নড়বড়ে, বাড়ছে ঝুঁকি
দুর্গম পাহাড়ে সিঁড়িটির অবস্থান। পুরোটাই নির্মিত হয়েছে লোহা দিয়ে। ৩০০ ধাপের এ সিঁড়ি দূর থেকে দেখে পছন্দ করবেন না, এমন মানুষ কমই আছেন। মেঘ ছুঁতে ছুঁতে ওপরে উঠেছে বলে স্থানীয় বাসিন্দারা এর নাম দিয়েছেন ‘স্বর্গের সিঁড়ি’। তবে এখন এই সিঁড়িতে মরিচা ধরেছে। ভাঙা সিঁড়ির ধাপ ও নড়বড়ে রেলিংয়ের কারণে আতঙ্কে থাকতে হয় বাসিন্দাদের।
খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার পেরাছড়া ইউনিয়নের মায়ুং কপাল পাহাড়ে প্রায় ৩০৮ ফুট দৈর্ঘ্যের এই সিঁড়ির অবস্থান। ত্রিপুরা ভাষায়, ‘মায়ুং’ অর্থ ‘হাতি’ আর ‘কপাল’ অর্থ ‘মাথা’। পাহাড়টি দেখতে অনেকটা হাতির মাথার মতো। চাকমাদের কাছে পাহাড়টি ‘এদো শিরে মোন’ নামে পরিচিত। তবে বাঙালি পর্যটকদের কাছে পাহাড়টির নাম ‘হাতিমাথা’ বা ‘হাতিমুড়া’, আর সিঁড়িটির নাম স্বর্গের সিঁড়ি।
২০১৫ সালে সিঁড়িটি নির্মাণ করে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড। প্রায় ১১০-১২০ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে নির্মিত এ সিঁড়িতে রয়েছে ৩০০টি ধাপ। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১ হাজার ২০৮ ফুট উচ্চতায় মায়ুং কপাল পাহাড়। এই পাহাড়ে রয়েছে ১৫টি ত্রিপুরা পাড়া। মূলত পাড়াবাসী এই সিঁড়ি ব্যবহার করে থাকেন। তবে বর্তমানে এটি জেলার অন্যতম দর্শনীয় স্থান হিসেবেও পরিচিত।
সিঁড়ির বিভিন্ন স্থানে লোহার ধাপ ভেঙে গেছে। আবার কোথাও ধাপ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নও হয়েছে। ওই স্থানে স্থানীয় বাসিন্দারা কাঠ বেঁধে অস্থায়ীভাবে চলাচলের ব্যবস্থা করেছেন। অনেক জায়গায় লোহার পাতও বেঁকে গেছে। আবার রেলিংও নড়বড়ে হয়ে পড়েছে।
সম্প্রতি সরেজমিনে ওই সিঁড়িতে গিয়ে দেখা যায়, সিঁড়ির বিভিন্ন স্থানে লোহার ধাপ ভেঙে গেছে। আবার কোথাও ধাপ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নও হয়েছে। ওই স্থানে স্থানীয় বাসিন্দারা কাঠ বেঁধে অস্থায়ীভাবে চলাচলের ব্যবস্থা করেছেন। অনেক জায়গায় লোহার পাতও বেঁকে গেছে। আবার রেলিংও নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। বর্ষার পানিতে সিঁড়ি পিচ্ছিল হওয়ায় চলাচলের ঝুঁকি আরও বেড়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিদিন ত্রিপুরাপাড়ার অনেক শিক্ষার্থী, নারী, শিশু ও বয়স্ক ব্যক্তিরা এই সিঁড়ি ব্যবহার করে পাহাড়ে ওঠানামা করেন। বিকল্প কোনো নিরাপদ পথ না থাকায় ঝুঁকি জেনেও সবাই বাধ্য হয়ে এটি ব্যবহার করছেন। সিঁড়ি নির্মাণের আগে এ ভোগান্তি আরও বেশি ছিল। তখন গাছ ধরে পাহাড়ে উঠতে হতো। এখন দীর্ঘদিন সিঁড়ি সংস্কার না হওয়ায় আবার দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
জানতে চাইলে স্থানীয় কৃষক আলোক বরণ ত্রিপুরা প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের এলাকার মানুষ জুমচাষ ও বাগানের ওপর নির্ভরশীল। প্রতি সপ্তাহে কৃষিপণ্য বাজারে নিয়ে বিক্রি করে সংসার চালাতে হয়। সিঁড়ি হওয়ার পর কিছু ব্যবসায়ী পাহাড়ে এসে কৃষিপণ্য কিনে নেওয়া শুরু করেন। আবার অনেক পর্যটকও আসেন। কিন্তু সিঁড়ির বর্তমান অবস্থা দেখে অনেকে আর আসতে চান না। দ্রুত সংস্কার না হলে আমাদের কষ্ট আরও বাড়বে।’
একই কথা বলেন স্থানীয় পেরাছড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান তপন বিকাশ ত্রিপুরা। তিনি বলেন, সিঁড়িটি নির্মাণের পর স্থানীয় মানুষের চলাচল সহজ হওয়ার পাশাপাশি পর্যটকদের আগমনও বেড়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিন সংস্কার না করায় এটি এখন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এর দ্রুত সংস্কার করা জরুরি। তা না হলে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
সিঁড়ি সংস্কারের বিষয়ে জানতে চাইলে খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক মো. সাদাত আনোয়ার বলেন, তিনি নিজে গিয়ে সিঁড়িটি পরিদর্শন করেছেন। এটি পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের আওতাধীন হওয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। জেলার আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত সভাতেও বিষয়টি আলোচনা হয়েছে। উন্নয়ন বোর্ড দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের খাগড়াছড়ির নির্বাহী প্রকৌশলী মুজিবুল আলম বলেন, ‘সিঁড়ির বিষয়টি আমরা জানি। ঝুঁকিপূর্ণ এই সিঁড়ি আগামী শুষ্ক মৌসুমে সংস্কারের পরিকল্পনা রয়েছে।’