ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে বিদায় নিলেন প্রিয় শিক্ষক

সোনাখাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. হাফিজুর রহমান সরকারকে ঘোড়ার গাড়িতে চড়িয়ে বিদায় দেওয়া হয়। শুক্রবার দুপুরে সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার সোনাখাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় চত্বরেছবি: সংগৃহীত

ফুল ও রঙিন কাপড়ে সাজানো ঘোড়ার গাড়ি। তাতে বসে আছেন একজন শিক্ষক। চারপাশে শিক্ষার্থী ও গ্রামের তরুণদের ভিড়। বাজছে বাদ্যযন্ত্র। গ্রামের পথ ধরে এগিয়ে চলছে শোভাযাত্রা। এটি প্রিয় শিক্ষককে বিদায় জানানোর আয়োজন। দীর্ঘ ৩৬ বছরের শিক্ষকতাজীবন শেষে অবসরে যাওয়া সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার সোনাখাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. হাফিজুর রহমান সরকারকে এভাবেই বিদায় জানিয়েছেন বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও গ্রামের তরুণেরা।

শুক্রবার সোনাখাড়া গ্রামে এই ব্যতিক্রমী আয়োজন করা হয়। হাফিজুর রহমান সোনাখাড়া গ্রামের বাসিন্দা। ১৯৯০ সালে ওই বিদ্যালয়ে তিনি শিক্ষকতা শুরু করেন। একই বিদ্যালয়ে তাঁর পুরো কর্মজীবন কেটেছে। গত বৃহস্পতিবার ছিল বিদ্যালয়ে তাঁর শেষ কর্মদিবস। তবে গ্রামের অনেক প্রাক্তন শিক্ষার্থী পড়াশোনা ও চাকরির কারণে বিভিন্ন জায়গায় থাকেন। প্রিয় শিক্ষকের বিদায়ের মুহূর্তে যেন সবাই থাকতে পারেন, সে জন্য ছুটির দিনটি বেছে নেন আয়োজকেরা।

বিদায় অনুষ্ঠানে শিক্ষক হাফিজুর রহমানকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। শুক্রবার দুপুরে সোনাখাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে
ছবি: সংগৃহীত

শুক্রবার দুপুরে ওই বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে শুরু হয় মূল অনুষ্ঠান। সেখানে জড়ো হন বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও স্থানীয় মানুষেরা। একে একে উঠে আসে হাফিজুর রহমানের দীর্ঘ শিক্ষকতাজীবনের নানা স্মৃতি। প্রিয় শিক্ষককে নিয়ে বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা। শেষে হাফিজুর রহমানের হাতে তুলে দেওয়া হয় সম্মাননা স্মারক ও বিভিন্ন উপহার।

অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, হাফিজুর রহমান অক্ষরজ্ঞান দেওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের ভালো মানুষ হওয়ার শিক্ষা দিয়েছেন। দীর্ঘ কর্মজীবনের শেষে তাঁকে এভাবে সম্মান জানাতে পেরে তাঁরা গর্বিত।

শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়। শুক্রবার দুপুরে রায়গঞ্জ উপজেলার সোনাখাড়া গ্রামে
ছবি: সংগৃহীত

নিজের বিদায়ের এমন আয়োজন দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন হাফিজুর রহমানও। শিক্ষার্থীদের ভালোবাসা ও এলাকাবাসীর শ্রদ্ধার জন্য তিনি সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। তরুণদের এমন সুসংগঠিত ও ব্যতিক্রমী উদ্যোগেরও প্রশংসা করেন তিনি।

সোনাখাড়া গ্রামের বাসিন্দা ও খুলনার উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের অতিরিক্ত পরিচালক খ ম রেজাউল করিম বলেন, ‘নতুন প্রজন্ম যেখানে মোবাইল ফোন ও ফেসবুকে আসক্ত, সেখানে আমার গ্রামের তরুণেরা তাঁদের শিক্ষকের প্রতি যে ব্যতিক্রমী ও জাঁকজমকপূর্ণ বিদায় অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছেন, তা এককথায় অনন্য।’

ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে বাড়ি ফিরছেন শিক্ষক হাফিজুর রহমান। শুক্রবার দুপুরে রায়গঞ্জ উপজেলার সোনাখাড়া গ্রামে
ছবি: সংগৃহীত

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ওই বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক মো. সুলতান মাহমুদ। বক্তব্য দেন সোনাখাড়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) প্যানেল চেয়ারম্যান আবদুল জাব্বার, রূপাখাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক স্বপন কুমার সরকার, সোনাখাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আফরুনা খানম ও স্থানীয় বাসিন্দা আবদুল হালিম সরকার।

অনুষ্ঠান শেষে সাজানো ঘোড়ার গাড়িতে করে হাফিজুর রহমানকে তাঁর নিজ বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয়। প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের কাছে এটি শুধু বিদায় অনুষ্ঠান ছিল না, ছিল প্রিয় শিক্ষককে ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা জানানোর আয়োজন। শিক্ষকতাজীবনের সমাপ্তিতে শিক্ষার্থীদের এই ভালোবাসা হয়ে থাকল তাঁর জীবনের স্মরণীয় এক অধ্যায়।