সখীপুরে অসময়ে ৫০ লাখ টাকার টক বরই বিক্রি করলেন সিদ্দিক

বরইবাগানে সিদ্দিক হোসেন। গতকাল বৃহস্পতিবার তোলা
ছবি: প্রথম আলো

‘কুল পাকে ফাগুনে’ সুকুমার রায়ের পাকাপাকি কবিতার ওই লাইন থেকে বুঝা যায়, বরই সাধারণত পাকে ফাগুন মাসে। তবে টাঙ্গাইলের সখীপুরের চাষি সিদ্দিক হোসেনের বাগানের বরই অগ্রহায়ণে পাকে। আগাম জাতের এই টক বরই প্রতি কেজি ১২০ থেকে ১৬০ টাকা দরে বিক্রি করেন তিনি।

বরই মৌসুমে অর্থাৎ ফাগুন মাসে বাজারে বরই বিক্রি হয় মাত্র ২০ থেকে ৪০ টাকা কেজি দরে। একটু কৌশল করে চাষাবাদ করায় তাঁর এ সফলতা এসেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার এক দিনেই তিনি সাড়ে তিন লাখ টাকার বরই বিক্রি করেন। এ নিয়ে এবার তাঁর বরই বিক্রি দাঁড়াল ৫০ লাখ টাকা। জানুয়ারিতে আরও অন্তত ২০ লাখ টাকার বরই বিক্রির আশা করছেন তিনি।

সিদ্দিক হোসেনের বাড়ি সখীপুর উপজেলার টিকুরিয়া চালা গ্রামে। এক যুগ ধরে তিনি নার্সারিসহ নানা ধরনের ফল উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন। নিজ গ্রাম ও আশপাশের আরও ৪ গ্রামে মোট ২৭ একর জমিতে ৪টি টক বরইয়ের আগাম জাতের বাগান করেছেন তিনি। বছরে ৪০ হাজার টাকা একর জমি ভাড়া নিয়ে তিনি চার হাজার বরই গাছ লাগিয়েছিলেন। এ বছর তাঁর ওই চার হাজার গাছেই বরই ধরেছে।

সিদ্দিক হোসেন বলেন, কয়েকটি বাগানে বরইগাছের ফাঁকে ফাঁকে উন্নত জাতের কমলা, মাল্টা, পেয়ারা, সফেদা, জাম্বুরা, ডালিম, বেল ও রামভুটান গাছও লাগিয়েছেন। বরইগাছ থেকে বরই তোলা শেষ হলে গোড়ার দিকে দুই ফুট পরিমাণ গাছ রেখে কেটে ফেলা হয়। ওই সময় বরইগাছের ফাঁকে বোনা অন্যান্য ফল গাছ থেকেও ফলন পান তিনি।

বাগান থেকে বরই তোলার পর তা বাছাই করছেন নারী ও পুরুষ শ্রমিকেরা। গতকাল বৃহস্পতিবার তোলা
ছবি: প্রথম আলো

গতকাল সিদ্দিকের বরইবাগানে গিয়ে দেখা যায়, ২০ থেকে ২৫ জন নারী ও পুরুষ শ্রমিক কেউ গাছ থেকে বরই পারছেন, আবার কেউ মাটি থেকে বরই তুলে জড়ো করছেন। আবার কেউ কেউ বাগান থেকে সংগ্রহ করা বরই বাছাই করে বস্তায় ভরছিলেন। বিকেলে সেগুলো তাঁর নিজস্ব পিকআপ ভ্যানে ঢাকার কারওয়ান বাজার, যাত্রাবাড়ী, শ্যামবাজার ও গাজীপুরে পাঠান। তাঁর ৪টি বরইবাগানে ২০ জন নারী শ্রমিক ও ১০ জন পুরুষ শ্রমিক সারা বছরই কাজ করেন।

বরই চাষে জড়িয়ে পড়ার গল্প বলতে গিয়ে সিদ্দিক বলেন, এসএসসি পাস করার পর কলেজে ভর্তি হলেও আর পড়াশোনা হয়নি তাঁর। ২০০৩ সালের দিকে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকায় যাওয়ার জন্য পাঁচ লাখ টাকা জমা দেন। দালাল চক্র তাঁর টাকা নিয়ে উধাও হয়ে যায়। একপর্যায়ে অনেকটা নিঃস্ব ও হতাশ হয়ে পড়েন তিনি। ওই সময় বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক থেকে ৫০ হাজার টাকা ঋণ করে ‘বিকল্প নার্সারি’ নামে একটি নার্সারি গড়ে তোলেন। নার্সারি থেকে তাঁর বেশ আয় হতে থাকে। ২০০৯ সালে তিনি নার্সারির মালিক হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর পুরস্কার লাভ করেন। এরপর তিনি আগাম জাতের বরই চাষ করার লক্ষ্য নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। চার বছর ধরে আগাম টক বরইয়ে আসে তাঁর সফলতা।

সিদ্দিক আরও বলেন, ১০ বছর আগে তাঁর বাড়িতে একটি আগাম জাতের বরইগাছ ছিল। ওই গাছ থেকেই তিনি পর্যায়ক্রমে কলম করে চার হাজার গাছ বুনেছেন। মৌসুম শুরুর দুই মাস আগেই এই বরই পাকায় বাজারে এর চাহিদা থাকে। এখন বাজারে তিনি ১৬০ টাকা কেজি দরে বরই বিক্রি করছেন। ঢাকা শহরে এই বরই ২০০ থেকে ২২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গত বছর তিনি ৫০ লাখ টাকার বরই বিক্রি করেছিলেন। এবার একমাসেই ৫০ লাখ টাকার বরই বিক্রি করেছেন। আশা করছেন, আগামী মাসে আরও ২০ লাখ টাকার বরই বিক্রি করবেন।

কাকড়াজান ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান দুলাল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘সিদ্দিক একজন সফল চাষি। গত কয়েক বছরে কয়েকটি পুরস্কারও পেয়েছেন তিনি। বরই চাষে রয়েছে তাঁর বেশ সুনাম। গ্রামের মানুষ তাঁকে “বরই সিদ্দিক” নামে চেনেন ও ডাকেন। সিদ্দিক হোসেন আমাদের গর্ব।’

গাজীপুরের আয়নাল হক নামের এক পাইকারি ক্রেতা গতকাল বিকেলে প্রথম আলোকে বলেন, সিদ্দিকের বাগান থেকে বরই নিয়ে তিনি ঢাকার কারওয়ান বাজার, শ্যামবাজার, উত্তরা, গাজীপুরসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করেন।

সখীপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত কৃষি কর্মকর্তা আয়েশা আক্তার আজ শুক্রবার সকালে প্রথম আলোকে বলেন, উপজেলার মধ্যে সিদ্দিক একজন কৌশলী ও সফল বরইচাষি। তাঁর সাফল্য দেখে সখীপুরে শতাধিক ব্যক্তি বরই চাষে উৎসাহী হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন সফলও হয়েছেন।