‘এক রাতেই দেড় হাজার মুরগি মরে গেল, আমার সব শেষ’
‘রাতে স্বাভাবিকভাবে ঘুমিয়েছিলাম। ভোরে উঠে দেখি ঘরে পানি। পাশের খামারে গিয়ে দেখি একটা মুরগিও জীবিত নেই। ১ হাজার ৫০০ মুরগির সব মরে গেছে। এক রাতেই আমার সব শেষ হয়ে গেল।’
কথাগুলো বলছিলেন ইয়াসমিন আক্তার (৫০)। তিনি খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার সুধীর মেম্বার পাড়ার বাসিন্দা। গত শুক্রবার রাতে তিন ঘণ্টার অতি ভারী বৃষ্টিতে তাঁর সোনালি মুরগির খামার ডুবেছে। এতে থাকা ১ হাজার ৫০০ মুরগিও পানিতে ডুবে মারা গেছে।
এক ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে ইয়াসমিনের সংসার। তাঁর মেয়ে দীঘিনালা সরকারি কলেজে স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষে পড়েন। আর ছেলে একই কলেজের উচ্চমাধ্যমিকে পড়ে। তিনজনের এ পরিবার চলে ইয়াসমিনের খামারের আয়ে। ১৭ বছর ধরে তিনি খামার পরিচালনা করছেন। আগে এতে ব্রয়লার মুরগি পালন করতেন। সম্প্রতি এক স্বজনের কাছ থেকে চার লাখ টাকা ঋণ নিয়ে সোনালি মুরগি পালন করেছিলেন। এক দফায় তিনি ইতিমধ্যে ৭৫ হাজার টাকা বিক্রি করেছেন।
উপজেলা প্রশাসন ও দীঘিনালা আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের সূত্রে জানা যায়, গত শুক্রবার দিবাগত রাত ১২টা থেকে ৩টা পর্যন্ত উপজেলায় ১০৩ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়। হঠাৎ অতি ভারী এ বৃষ্টিতে দীঘিনালার মেরুং, কবাখালী, হামতলী ও বোয়ালখালী এলাকার নিচু অঞ্চল প্লাবিত হয়। এতে কৃষিজমি, খামার ও বাড়িঘর ডুবে যায়।
গত শনিবার বিকেলে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ইয়াসমিনের খামারে চারপাশে এখনো কাদা ও পানির চিহ্ন। ডুবে মারা যাওয়া মুরগি সেখান থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। তবে খামারের ক্ষয়ক্ষতির ক্ষত স্পষ্ট হয়ে রয়েছে। খামারটির পাশ দিয়ে বয়ে গেছে বোয়ালখালী ছড়া। এ ছড়ার পানি বেড়ে তাঁর খামার ডুবেছিল।
‘আর কিছুদিন পরই মুরগিগুলো বিক্রি করার কথা ছিল। পুরো খামারটাই ঋণের টাকায় করা। এই ক্ষতি সামলানো আমাদের জন্য খুব কঠিন।’
ইয়াসমিন আক্তারের সঙ্গে যখন কথা হয়, তখন তিনি খামারটি পরিষ্কারের কাজ করছিলেন। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘লাভের আশায় ঋণ নিয়ে খামারটি গড়ে তুলেছিলাম। মুরগিগুলো বিক্রির উপযোগীও হয়ে উঠেছিল। কিন্তু আকস্মিক বন্যায় সব শেষ হয়ে গেছে। এত বড় ক্ষতি হবে, স্বপ্নেও ভাবিনি। এখন এ ঋণের টাকা কীভাবে শোধ করব, তা বুঝতেছি না। সরকারের পক্ষ থেকে সহযোগিতা পেলে আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারব।’
ইয়াসমিনের ভাই ওসমান গণি বলেন, ‘অনেক কষ্ট করে ও ঋণের টাকায় আমরা খামারটি গড়ে তুলেছিলাম। দেড় হাজার মুরগির প্রতিটির ওজন প্রায় ৫০০ গ্রাম হয়েছিল। আর কিছুদিন পরই মুরগিগুলো বিক্রি করার কথা ছিল। পুরো খামারটাই ঋণের টাকায় করা। এই ক্ষতি সামলানো আমাদের জন্য খুব কঠিন।’
উপজেলায় হঠাৎ অতি ভারী এ বৃষ্টিতে দীঘিনালার মেরুং, কবাখালী, হামতলী ও বোয়ালখালী এলাকার নিচু অঞ্চল প্লাবিত হয়। এতে কৃষিজমি, খামার ও বাড়িঘর ডুবে যায়।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. আল আমিন বলেন, বোয়ালখালী ছড়াটি উপজেলার তৈদুছড়া, বিষ্ণু কার্বারিপাড়া, জামতলী ও মায়াফাপাড়া হয়ে মাইনী নদীতে গিয়ে পড়েছে। এ ছড়ায় এত পানি আগে কখনো হয়নি। শুক্রবার রাতে পাহাড়ে অস্বাভাবিক ভারী বৃষ্টি হয়েছে। এতে ছড়ার পানি দ্রুত বেড়ে আশপাশের এলাকায় ঢুকে পড়েছে। জামতলী-বোয়ালখালী সড়কের ওপর দিয়েও পানি প্রবাহিত হয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত খামারি ইয়াসমিন আক্তারের পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। জানতে চাইলে দীঘিনালা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. তানজিল পারভেজ বলেন, পাহাড়ি ঢল ও ভারী বর্ষণে ইয়াসমিন আক্তারের খামার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টি তিনি জানতে পেরেছেন। জেলা প্রশাসক ক্ষতিগ্রস্ত খামারির পাশে দাঁড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন। উপজেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সহায়তায় তাঁকে সহায়তা করা হবে।