বাবুর কলেই শুধু মিষ্টিপানি, বাকি সব লোনা আর ঘোলা

খুলনার কয়রা উপজেলার শেখসরদারপাড়া গ্রামের ধীমান বাবুর নলকূপে মিষ্টি পানি মেলে। আশপাশের নলকূপে লবণাক্ত পানি ওঠায় তা পানের অযোগ্য। এখান থেকে সবাই তাই পানি নিতে আসেন
ছবি: প্রথম আলো

‘বাড়ির আশপাশে কলের পানি নোনতা আর ঘোলা। প্রচণ্ড তেষ্টা সত্ত্বেও তা খাওয়া যায় না। প্রতি কলস পানি ১০ টাকায় কিনে খাওয়ার মতো সামর্থ্যও নেই। বাধ্য হয়ে দুই কিলোমিটার হেঁটে ধীমান বাবুর কলে আসি পানি নেব বলে। কয়েক গ্রামের মধ্যে শুধু বাবুর কলেই মিষ্টিপানি, বাকি সব লোনা আর ঘোলা।’ আক্ষেপভরা কণ্ঠে কথাগুলো বলেন খুলনার কয়রা উপজেলার কাটকাটা গ্রাম থেকে শেখসরদারপাড়া গ্রামে খাবার পানি নিতে আসা চল্লিশোর্ধ্ব গৃহবধূ মনজিলা বেগম।

পাশে দাঁড়িয়ে পানির জন্য অপেক্ষায় থাকা দীঘিরপাড় গ্রামের দীপা মণ্ডল বলেন, ‘সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ১০ গ্রামের মানুষ এই কলের পানি নেয়। একটামাত্র নলকূপ হওয়ায় অনেক সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা দেরি হয়। ধনী মানুষেরা পানি কিনে খাচ্ছে, কিন্তু গরিব মানুষগো ভরসা শুধু এই টিউবওয়েল।’

খুলনার কয়রা উপজেলার সুন্দরবন–সংলগ্ন উত্তর বেদকাশী ইউনিয়নের বতুলবাজার, পাথরখালী, গেটেরগোড়া, পানবাড়িয়া, কাটকাটা, দীঘিরপাড়, গাজিপাড়া, শেখসরদারপাড়া, কাটমারচর, গাববুনিয়া গ্রামে দীর্ঘদিন ধরে খাবার পানির তীব্র সংকট। এই ১০ গ্রামের অন্যান্য নলকূপের পানি ঘোলা ও লবণাক্ত হওয়ায় তা পানের অযোগ্য। যে কারণে জীবন বাঁচানোর তাগিদে এসব গ্রামের নারী ও শিশুরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় ব্যয় করে দুই থেকে চার কিলোমিটার দূরের শেখসরদারপাড়া গ্রামের ধীমান বাবুর নলকূপে পানি নিতে আসেন।

সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ১০ গ্রামের মানুষ এই কলের পানি নেয়। একটামাত্র নলকূপ হওয়ায় অনেক সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা দেরি হয়।
দীপা মণ্ডল, দীঘিরপাড় গ্রামের বাসিন্দা

দিনরাত মিলিয়ে ধীমান বাবুর বাড়ির নলকূপ থেকে হাজারো মানুষ পানি নেন। মানুষের ভিড় লাঘবে যাঁরা দূর থেকে ভ্যান গাড়িতে ড্রাম সাজিয়ে পানি নিতে আসেন, তাঁদের জন্য নলকূপ থেকে বৈদ্যুতিক মোটরের মাধ্যমে পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন ধীমান বাবু। মানুষকে সুপেয় পানি বিলাতে গিয়ে অবশ্য নিজের গাঁটের টাকাও খোয়াতে হচ্ছে তাঁকে। মানুষের অতিরিক্ত চাপে প্রায়ই নলকূপ নষ্ট হয়। নিজ খরচে বারবার নলকূপ সারাই করেন তিনি। তবে এতে তাঁর আফসোস নেই। যত দিন মানুষ তাঁর বাড়িতে আসবেন, তত দিন এভাবে পানি দেওয়া চালিয়ে যেতে চান ধীমান বাবু।

ধীমান বাবু বলেন, সুন্দরবন–সংলগ্ন উত্তর বেদকাশী ইউনিয়নের প্রায় সব এলাকায় নলকূপ স্থাপন করা হলেও তাতে মিঠাপানি ওঠে না। একমাত্র তাঁর নলকূপটিতেই খাবার উপযোগী পানি মিলছে। ১২ বছর আগে নিজের বাড়িতে নলকূপটি স্থাপন করেন তিনি। তবে তাঁর নলকূপের পানি সুপেয় কেন, সেটার ব্যাখ্যা তিনি জানেন না। তিনি বলেন, একই মাপের পাইপ বসিয়ে আশপাশে কয়েক দফা চেষ্টা করা হলেও সুপেয় পানি আসেনি। আশপাশের ১০-১২টি গ্রামের প্রায় ২০ হাজারের বেশি মানুষ এখান থেকে পানি সংগ্রহ করেন। বাড়ির কলপাড়ে ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত মানুষের ভিড় লেগে থাকে। নলকূপের ওপর চাপ কমাতে মূল কলের পাইপের সঙ্গে বৈদ্যুতিক মোটরের সংযোগ দিয়ে পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করেছেন।

পানির কষ্টের চেয়ে বড় কষ্ট আর কিছুতে নেই। মানুষকে পানি দেওয়া মহৎ কাজ। তাঁর ছেলে নলকূপটি বসিয়ে ভালো কাজই করেছেন।
ধীমান বাবুর মা রাধো বালা ঘোষ

গাজিপাড়া গ্রাম থেকে পানি নিতে আসা সুষমা রানী বলেন, অন্য নলকূপের পানি পান করে আমাশয় লেগেই থাকত। কিন্তু এখান থেকে পানি নিয়ে পানের পর এই সমস্যা আর হচ্ছে না।

স্থানীয় বাসিন্দা ও উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, লবণাক্ততার কারণে কয়রা উপজেলার অধিকাংশ এলাকায় খাবার পানির চাহিদা মেটাতে মানুষ বৃষ্টির পানি ধরে রাখেন। কোনো কোনো এলাকায় পুকুরের পানি সংগ্রহ করে তাতে ফিটকিরি বা পানি বিশুদ্ধকরণ বড়ি মিশিয়ে খাবার উপযোগী করা হয়। সুপেয় পানির সংকট দূর করতে সরকারি ও বেসরকারিভাবে উপজেলায় অনেক উদ্যোগই নেওয়া হয়েছে। কিন্তু কোনোটিই তেমন কাজে আসেনি। প্রায় সব এলাকায় নলকূপ স্থাপন করা হলেও তাতে মিঠাপানি ওঠে না।

ধীমান বাবুর মা রাধো বালা ঘোষ বলেন, পানির কষ্টের চেয়ে বড় কষ্ট আর কিছুতে নেই। মানুষকে পানি দেওয়া মহৎ কাজ। তাঁর ছেলে নলকূপটি বসিয়ে ভালো কাজই করেছেন। অনেক সময় মানুষের ভিড়ে নিজেদের পানি নিতেও দেরি হয়। তবুও এলাকার মানুষের উপকার করতে পেরে তাঁরা খুশি।

কয়রা উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী ইশতিয়াক আহমেদ বলেন, এ অঞ্চলের মানুষের খাবার পানির সমস্যা দীর্ঘদিনের। লবণাক্ততার কারণে অধিকাংশ স্থানে গভীর নলকূপ বসানোর চেষ্টা সফল হয় না। ধীমান বাবুর নলকূপটি ব্যতিক্রম।