ডাকপিয়ন আনোয়ারকে এখন আর কেউ ঘরে ডাকেন না
৩০ বছর ধরে ডাকপিয়নের চাকরি করা আনোয়ার হোসেন কুতুবী দেখেছেন চিঠির যুগের উত্থান ও পতন। একসময় মানুষের আনন্দ–বেদনার সাক্ষী থাকা এই পোস্টম্যানের কাজ আজ সীমিত হয়ে এসেছে আদালত ও ব্যাংকের রেজিস্ট্রি চিঠিতে। বদলে যাওয়া সময়ের সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে চিঠির অপেক্ষা আর ডাকপিয়নের ডাক।
১৬ বছর আগের কথা। ডাকপিয়ন (পোস্টম্যান) আনোয়ার হোসেন কুতুবী তখন টেকনাফ পোস্ট অফিসে কাজ করেন। উপজেলার মহেশখালীয়া পাড়ার এক বাড়িতে চিঠি নিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। চিঠি পড়ে তাঁর সামনেই গৃহকর্তা কান্নায় ভেঙে পড়েন। তাঁর ছেলে দীর্ঘদিন ধরেই নিখোঁজ। খোঁজ না পেয়ে বেঁচে থাকার আশাও ছেড়ে দিয়েছিলেন। চিঠিটা হারিয়ে যাওয়া সেই ছেলের লেখা। ভারতের একটি কারাগার থেকে তিনি চিঠি লিখেছিলেন। বন্ধুদের সঙ্গে অবৈধভাবে ভারতে বেড়াতে গিয়ে গ্রেপ্তার হন। হারানো ছেলের সন্ধান পেয়ে আনন্দ-বেদনার মিশ্র অনুভূতিতে ওই ব্যক্তি সেদিন অঝোরে কেঁদেছিলেন। জড়িয়ে ধরেছিলেন ডাকপিয়ন আনোয়ার হোসেন কুতুবীকে।
৩০ বছর ধরে ডাকপিয়নের চাকরি করেন কক্সবাজারের কুতুবদিয়ার আনোয়ার হোসেন। মহেশখালীয়া পাড়ার ওই ঘটনার মতো বহু আনন্দ-বেদনার দৃশ্যের সাক্ষী তিনি। চাকরিতে যোগদানের পর সারা দিনই চিঠি বিলাতে ব্যস্ত সময় কাটাতে হতো তাঁকে। গ্রামের পথ দিয়ে যাওয়ার সময় লোকজন ঘিরে ধরতেন। জানতে চাইতেন, তাঁদের চিঠি এসেছে কি না। চিঠি পেয়ে অনেকে ঘরে ডেকে আপ্যায়ন করতেন। দিতেন বকশিশও। তবে গত ১০-১২ বছরে এই চিত্র পাল্টে গেছে। এখন আর কেউ চিঠির অপেক্ষায় থাকেন না। চিঠি পেয়ে ঘরে ডাকেন না। জড়িয়ে ধরেন না। মুঠোফোন, ই–মেইলের যুগে আজকাল কেউ চিঠিও লেখেন না। এখন আনোয়ার আদালত কিংবা ব্যাংকের রেজিস্ট্রি চিঠি আর জরুরি পার্সেল বিলি করেন।
কক্সবাজার শহরের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকায় সম্প্রতি দেখা হয় আনোয়ারের সঙ্গে। কাঁধে ডাকের ব্যাগ, হাতে ছাতা ও বেশ কিছু চিঠি। ছোটখাটো মানুষ, চুল-দাড়িতে পাক ধরেছে। কথা বলতে চাইলে সানন্দে রাজি হন। এখন কি কেউ চিঠি লেখেন? জানতে চাইলে হেসে নিজের হাতে থাকা কয়েকটি খাম দেখান আনোয়ার। সব কটিই রেজিস্ট্রি করা। কোনোটিই ব্যক্তিগত নয়। আদালত, ব্যাংক আর সরকারি অফিসের চিঠি। আনোয়ারের মতে, চিঠি লেখার যুগ শেষ। তবে একসময় মানুষ ঠিকই চিঠির অপেক্ষায় থাকতেন।
টেকনাফের জালিয়াপাড়ার এক গৃহবধূর কথা মনে পড়ে আনোয়ার হোসেনের। স্বামী মধ্যপ্রাচ্যে চাকরি করতেন। ওই গৃহবধূ প্রতিদিন প্রবাসী স্বামীর চিঠির অপেক্ষায় থাকতেন। লোক পাঠিয়ে তাঁর কাছে খোঁজ নিতেন চিঠি এসেছে কি না? ঘরের দরজায় টোকা পড়লে ওই গৃহবধূ ছুটে আসতেন। তাঁকে দেখলেই জানতে চাইতেন চিঠি এসেছে কি না।
চিঠি, চিঠি...
চিঠি লেখার যুগের অবসান ঘটেছে গত শতকের শুরুতে। গত শতকের নব্বইয়ের দশকে ফিডব্যাকের মাকসুদের গাওয়া ‘আজ তোমার চিঠি/ যদি না পেলাম হায়/ নাকি ভেবে নেব/ ডাকপিয়নের অসুখ হয়েছে।’ গানটি হয়তো আনোয়ার শোনেননি। হয়তো শোনেননি পঙ্কজ উদাসের গাওয়া ‘চিটঠি আয়ি হ্যায়’ গানটিও। কিন্তু চিঠি লেখার জমজমাট দিনগুলো ঠিকই পেয়েছিলেন আনোয়ার। এ কারণে তখন ডাকপিয়ন বা পোস্টম্যানের চাকরিতে ঢুকে গর্বিতই হয়েছিলেন তিনি।
১৯৯৪ সালের ১ ডিসেম্বর পোস্টম্যান পদে চাকরি শুরু আনোয়ার হোসেন কুতুবীর। এর তিন বছর আগে; অর্থাৎ ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল স্মরণকালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে আনোয়ারের বাড়ি লন্ডভন্ড হয়ে যায়। বসতভিটা বিলীন হয় সাগরে। মৃত্যু হয় তাঁর চারজন চাচাতো ভাই–বোনের। সংসারের হাল ধরতে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেই চাকরিতে ঢুকতে হয়েছিল তাঁকে।
চাকরির প্রথম পোস্টিং হয় টেকনাফে। সেখানেই কেটে যায় টানা ১৫ বছর। টেকনাফের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে আনোয়ার হোসেন বলেন, নির্দিষ্ট গন্তব্যে চিঠিপত্র পৌঁছে দেওয়া ছিল তাঁর দায়িত্ব। সময়মতো চিঠিপত্র, মানি অর্ডারের টাকা হাতে পেলে মানুষজন খুশি হতেন। অনেকে বকশিশ দিতেন।
টেকনাফে দৈনিক ৩০০ চিঠি বিলি করতে হতো তাঁকে। ওই সময় ‘চিঠি, চিঠি’ ডাক শুনে যে উচ্ছ্বাস নিয়ে মানুষ ছুটে আসতেন, সেই উচ্ছ্বাস এখন আর দেখতে পান না। এখন এর অর্ধেক চিঠিও বিলি করেন না তিনি। কোনো কোনো দিন একদম ফাঁকাও যায়।
২০১০ সালের শেষ দিকে টেকনাফ থেকে বদলি হয়ে কক্সবাজার শহরের প্রধান ডাকঘরে যোগ দেন আনোয়ার হোসেন। এখানে কাজ করছেন ১৫ বছর ধরে। শহরের প্রধান সড়ক, বন বিভাগ-সার্কিট হাউস রোড, সৈকত–হোটেল–মোটেল জোন, বাইপাস সড়ক, পুলিশ লাইনস, জেলা কারাগার, পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের জলবায়ু উদ্বাস্তুদের গ্রাম কুতুবদিয়াপাড়া, নাজিরারটেক, সমিতিপাড়া, বাসিন্যাপাড়া, শহরের বাহারছড়া, কলাতলী, মেরিন ড্রাইভের দরিয়ানগর, সমুদ্রসৈকত এলাকায় প্রতিদিন হেঁটে চিঠি ও পার্সেল বিলি করেন তিনি।
স্ত্রী হাসিনা আক্তার এবং একমাত্র সন্তান আবদুল্লাহ আল ফোয়াদকে নিয়ে আনোয়ার থাকেন কক্সবাজার পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের পাহাড়তলী রহমানিয়া মাদ্রাসার পাশের একটি টিনশেডের ভাড়া বাসায়। ছেলে আবদুল আল ফোয়াদ পড়ছে চট্টগ্রামের ইসলামিক ইউনিভার্সিটিতে, ফার্মাসি বিভাগে। এখন স্বামী-স্ত্রীর ছোট সংসার। মানুষের হাসি-আনন্দের খবর কমেছে। কমেছে জীবনে আনন্দের উৎস। তবু জীবন চলে যাচ্ছে কোনোমতে।
চিঠি, পার্সেল বিলি করতে গিয়ে দুর্ঘটনায়ও পড়তে হয়েছে আনোয়ার হোসেনকে। পাঁচ বছর আগের কথা। কক্সবাজার শহরের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে রাস্তায় চিঠি বিলি করার সময় পেছন থেকে ধাক্কা মারে একটি মোটরসাইকেল। তখন তিনি রাস্তায় ছিটকে পড়েন, ডান পায়ে আঘাত পান। গত আট বছরে এ রকম দুর্ঘটনার কবলে পড়েছেন আরও চারবার। কিন্তু এক দিনও থেমে থাকেননি তিনি। শরীরে জ্বর, সর্দি–কাশি যা–ই থাকুক, চিঠিপত্র এলে তো বসে থাকার উপায় নেই। সরল হাসি হেসে জানালেন আনোয়ার।