চৈত্রসংক্রান্তিতে বেড়ায় লোকজ ঐতিহ্যের মেলা

পাবনার বেড়া পৌর এলাকার মৈত্রবাঁধা মহল্লার একটি বাড়িতে পাটঠাকুর নিয়ে দলবদ্ধভাবে ভক্তদের আগমনছবি: প্রথম আলো

পাবনার বেড়া উপজেলায় বাংলা বছরের শেষ প্রান্তের ঐতিহ্যবাহী উৎসব চৈত্রসংক্রান্তিকে ঘিরে জমে উঠেছে গ্রামবাংলার লোকজ আয়োজন। মাসজুড়ে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় চলছে সনাতন ধর্মীয় আচার, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা ও সামাজিক সম্প্রীতির এক অনন্য চিত্র।

চৈত্র মাসের শুরু থেকেই উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে ১০ থেকে ২০ জনের দল গঠন করে তরুণ ও মধ্য বয়সীরা অংশ নিচ্ছেন এ আয়োজনে। লাল বা গেরুয়া রঙের পোশাক পরে ঢাকঢোল-কাঁসরের তালে তালে তাঁরা দোকান ও বাড়িতে বাড়িতে যাচ্ছেন। অনেকেই শিব-পার্বতীর সাজে, আবার কেউ বহুরূপীর বেশে লোকজ ঐতিহ্যের নানা রূপ তুলে ধরছেন।

এই আয়োজনে বিশেষভাবে লক্ষ করা যায় ‘পাটঠাকুর’ বহনের প্রথা। কাঠের তৈরি, তেল ও সিঁদুরে রাঙানো এই পাটঠাকুরকে ভক্তরা মাথায় করে নিয়ে যান, যা দেবতা শিবের প্রতিকৃতি হিসেবে বিবেচিত। প্রতিটি বাড়িতে গিয়ে পাটঠাকুর স্থাপন করে সংক্ষিপ্ত পূজা ও আচার সম্পন্ন করা হয়।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বাড়ির গৃহিণীরা চালুনিতে বা কুলায় করে চাল, ডাল, তরকারির সিধা এবং সামর্থ্য অনুযায়ী ২০, ৫০ বা ১০০ টাকা তুলে দেন উৎসবের দলগুলোর হাতে। এভাবে সংগৃহীত খাদ্যসামগ্রী ও অর্থ দিয়ে চৈত্রসংক্রান্তির দিন বা বাংলা বছরের শেষ দিনে অনুষ্ঠিত হয় মহোৎসব।

বেড়া উপজেলার কেন্দ্রীয় হরিবাড়ি মন্দির পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা সমীরণ চৌধুরী বলেন, ‘এই উৎসব শুধু ধর্মীয় আচার নয়, এটি আমাদের সমাজের ঐক্য ও পারস্পরিক সহযোগিতার প্রতীক। ছোট-বড় সবাই এতে অংশ নেয়, যা নতুন প্রজন্মকে ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত করে।’

চৈত্র মাসজুড়ে অংশগ্রহণকারী দলগুলোর সদস্যদের বিভিন্ন বাড়িতে নিরামিষ ভোজের আয়োজন করা হয়। এতে গ্রামীণ জীবনে উৎসবের আবহ আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।
ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবে চৈত্রসংক্রান্তির আগের দিন নারীদের উপবাস পালন ও বিশেষ পূজার প্রচলন আছে।

বাংলাদেশ পূজা উদ্‌যাপন পরিষদের বেড়া উপজেলা শাখার সভাপতি ভৃগুরাম হালদার বলেন, চৈত্রসংক্রান্তির আগের দিন সনাতন ধর্মাবলম্বী নারীরা উপবাস থাকেন এবং সন্ধ্যায় মহাদেবের পূজা করেন। মহাদেবের আরেক নাম ‘নীল’, এই বিশ্বাস থেকেই নীল পূজার আয়োজন করা হয়।

সংস্কৃতি ও ইতিহাস গবেষকদের মতে, চৈত্রসংক্রান্তির এই আয়োজনের শিকড় বহু প্রাচীন কৃষিভিত্তিক সমাজে প্রোথিত। বছরের শেষ প্রান্তে প্রকৃতি, ফসল ও জীবনের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতেই এই উৎসবের সূচনা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসবে রূপ নিয়েছে।

চৈত্রসংক্রান্তির দিন উপজেলার বিভিন্ন খোলা মাঠে বসে পূজা ও মেলা। এর মধ্যে অন্যতম আকর্ষণ চড়ক পূজা। ভক্তরা নানা আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে এই পূজা সম্পন্ন করেন। এবারও হিন্দু ধর্মীয় পঞ্জিকা অনুসারে চৈত্রসংক্রান্তির দিনে বেড়া পৌর এলাকার বনগ্রাম কালীবাড়ি চত্বরে অনুষ্ঠিত হবে চড়ক মেলা।

বেড়ার মনজুর কাদের মহিলা কলেজের ইতিহাস বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত সহকারী অধ্যাপক মনোয়ার হোসেন বলেন, পাটঠাকুর বহন, বাড়ি বাড়ি ঘোরা, চাল-ডাল সংগ্রহ—এসব বেড়ার দীর্ঘদিনের একটি বিশেষ ঐতিহ্য। এখানে ধর্মীয় আচার, লোকজ রীতি আর মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক একসঙ্গে জড়িয়ে আছে।