সুন্দরবনে কোস্টগার্ডের অভিযানের ঘটনায় দুই মামলা, দুলাভাই বাহিনীর প্রধানসহ গ্রেপ্তার ২
সুন্দরবনের কথিত বনদস্যু ‘দুলাভাই বাহিনী’র বিরুদ্ধে কোস্টগার্ডের অভিযানের ঘটনায় হত্যা, হত্যাচেষ্টা ও অস্ত্র আইনে পৃথক দুটি মামলা হয়েছে। মামলায় বাহিনীটির প্রধান রবিউল ইসলাম, সদস্য ইসরাফিল হাওলাদারসহ অজ্ঞাতপরিচয় আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে। ওই দুজনকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
আজ শনিবার সকালে বিষয়টি নিশ্চিত করে কয়রা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শাহ আলম বলেন, কোস্টগার্ডের পেটি অফিসার আরিফুল ইসলামের করা এজাহারের ভিত্তিতে দুটি মামলা গ্রহণ করা হয়েছে। একটি মামলায় হত্যা, হত্যাচেষ্টা, সরকারি কাজে বাধা, সরকারি সম্পত্তি নষ্টসহ দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধারা এবং অপরটি অস্ত্র আইনে করা হয়েছে। অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
কোস্টগার্ড ও পুলিশ সূত্র জানায়, গত বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে কয়রা উপজেলার তেঁতুলতলার চরসংলগ্ন আড়ুয়াশিবসা নদীর পাশে সুন্দরবনের বেশোখাল এলাকায় বিশেষ অভিযান চালানো হয়। কোস্টগার্ডের ভাষ্য অনুযায়ী, সদস্যদের উপস্থিতি টের পেয়ে বনদস্যুরা অতর্কিত গুলি চালালে আত্মরক্ষার্থে কোস্টগার্ডও পাল্টা গুলি চালায়। গোলাগুলি চলে গতকাল শুক্রবার ভোর পর্যন্ত। ওই অভিযানে একজন নিহত হয়েছেন। পরে ঘটনাস্থল থেকে ৬টি একনলা বন্দুক, ৬৯টি তাজা কার্তুজসহ বিভিন্ন আলামত উদ্ধার করা হয়েছে।
কোস্টগার্ডের দাবি, গোলাগুলির পর ঘটনাস্থল থেকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় রবিউল ইসলামসহ তিনজনকে উদ্ধার করা হয়।
তবে হাসপাতাল ও পুলিশ সূত্র জানায়, গতকাল সকালে সাকাত সরদার (৬৪) নামের একজনের মরদেহ এবং গুলিবিদ্ধ রবিউল ইসলামকে কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে আসে কোস্টগার্ড। পরে একই দিন দুপুরে সুন্দরবনসংলগ্ন বাবুরাবাদ এলাকা থেকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় দুলাভাই বাহিনীর সদস্য ইসরাফিল হাওলাদারকে আটক করে পুলিশ। বর্তমানে তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা রেজাউল করিম বলেন, গতকাল কোস্টগার্ড দুজনকে হাসপাতালে নিয়ে আসে। তাঁদের মধ্যে একজনকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। অপরজন রবিউল ইসলামকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। পরে পুলিশ গুলিবিদ্ধ আরও একজনকে হাসপাতালে ভর্তি করে।
গতকাল সকাল ৯টা ৫৫ মিনিটে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় রবিউল ইসলামকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। হাসপাতালের ভর্তি নথিতে তাঁর নামের পাশে ‘গানশট ইনজুরি’ উল্লেখ আছে। মহেশ্বরীপুর এলাকার একাধিক বাসিন্দার ভাষ্য, রবিউল ইসলামই ‘দুলাভাই বাহিনী’র প্রধান। একসময় সুন্দরবনে ‘ইলিয়াস বাহিনী’র তৎপরতা ছিল। ইলিয়াস নিহত হওয়ার পর ২০২৪ সালে তাঁর বোনের স্বামী রবিউল ইসলাম নতুন একটি দল গঠন করেন। পরে স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে সেটি ‘দুলাভাই বাহিনী’ নামে পরিচিতি পায়।
কয়রা থানার ওসি শাহ আলম বলেন, সাকাত সরদারের মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেছে পুলিশ। ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহটি খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।
এদিকে সাকাত সরদারের মেয়ে মরিয়ম খাতুনের দাবি, তাঁর বাবা পেশায় জেলে ছিলেন। কয়েক দিন আগে বনদস্যুরা তাঁকে মুক্তিপণের দাবিতে অপহরণ করে। এর পর থেকে পরিবার তাঁর ফেরার অপেক্ষায় ছিল।
তবে বর্তমানে সুন্দরবনে মাছের প্রজনন মৌসুম চলায় বনাঞ্চলে মাছ ধরা নিষিদ্ধ আছে। এ অবস্থায় সাকাত সরদার কীভাবে ঘটনাস্থলে ছিলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পরিবারের দাবি, তিনি কয়েক দিন ধরে বনদস্যুদের কাছে জিম্মি ছিলেন।
মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, গোলাগুলিতে কোস্টগার্ডের দুই সদস্য আহত হন এবং একটি স্পিডবোটের প্রায় পাঁচ লাখ টাকার ক্ষতি হয়। আত্মরক্ষার্থে কোস্টগার্ডের সদস্যরা ২১৬টি গুলি ও একটি ব্ল্যাংক কার্তুজ ছোড়েন। পরে ডুবুরি দল দিয়ে ঘটনাস্থলে তল্লাশি চালিয়ে ৬টি একনলা বন্দুক, ৬৯টি তাজা কার্তুজ, ৩টি খালি কার্তুজ, একটি দা, একটি বাটন মোবাইল ও একটি হাতঘড়ি উদ্ধার করা হয়েছে বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
কোস্টগার্ডের অভিযানের পর সুন্দরবনের ওই এলাকার পরিস্থিতি বর্তমানে স্বাভাবিক আছে বলে জানান সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এ জেড এম হাছানুর রহমান। তিনি বলেন, বন বিভাগের পক্ষ থেকে তিনটি টহল দল মোতায়েন করে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। কোস্টগার্ডের সঙ্গে সমন্বয় করে বন বিভাগ প্রয়োজনীয় কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।