তেঁতুলবাড়িয়া গ্রামের গৃহবধূ রানি বেগমের ঘরদোর কয়েক দিন ধরে হাঁটুপানির নিচে। চার সদস্যের সংসার জোয়ারের কবলে এলোমেলো। ঘুম নেই, আহার নেই। গত বৃহস্পতিবার দুপুরে তিনি বলছিলেন, ‘আগে বইন্নায় মোগো জীবনে দুর্গতি অইতো। এহন আর ঝড়-বইন্না অওন লাগে না। জোয়ারের ঝড়ে মোগো জীবন শ্যাষ।’

একই গ্রামের কোহিনুর, জায়েদা, খাদিজা, নাজমা ও নুরজাহান বলেন, ছোট ছোট ছেলেমেয়ে নিয়ে রাত–দিন ধৈর্য ধরে, খেয়ে না খেয়ে বেঁচে আছেন। বসতি নেই, খাবার নেই, নলকূপের পানি নেই। নুরজাহানের কথায়, ‘দুই ঘণ্টা হাইট্টা যাইয়্যা কলের (নলকূপ) এক কলস পানি আনছি। এলাকার সব কল পানিতে ডুইব্ব্যা গ্যাছে।’

কোহিনুর, নুরজাহানদের মতো এমন জীবনচিত্র বৃহত্তর অর্থে বরিশাল বিভাগের জেলাগুলোর চর, নিম্নাঞ্চল ও নদীতীরবর্তী এলাকায় বসবাসরত প্রায় সব মানুষেরই। কোনো পূর্বসংকেত ছাড়াই কঠিন প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হন তাঁরা।

নদ-নদীতে অধিক উচ্চতার জোয়ারের এই প্রবণতার শুরু ২০০৭ সালের ঘূর্ণিঝড় সিডরের সময় থেকে। এরপর যত ঝড় আঘাত হেনেছে, সব কটিতে জোয়ারের উচ্চতা বেড়েছে। শুধু ঘূর্ণিঝড় নয়, অমাবস্যা-পূর্ণিমার জোতেও ৮ থেকে ১২ ফুট উচ্চতার জোয়ারের কবলে পড়েছে লোকালয়।

সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বরিশালসহ দক্ষিণ উপকূলের নদ-নদীগুলোতে জোয়ারের উচ্চতা গত দেড় দশকে তিন থেকে চার ফুটের বেশি বেড়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) সূত্র জানায়, জলোচ্ছ্বাস রুখতে পারবে, এমন চিন্তা করেই ষাট ও সত্তরের দশকে বাঁধ দেওয়া হয়েছিল। নদীপাড়ে ১০ থেকে ১৩ ফুট এবং অভ্যন্তরে ৮ ফুট উচ্চতার বাঁধ করা হয়েছিল তখন। কিন্তু এখন ১০-১২ ফুট উচ্চতার জোয়ারও রুখতে পারছে না এসব বাঁধ। এ অঞ্চলের নদ-নদীর স্বাভাবিক জোয়ারের সর্বোচ্চ উচ্চতা ৬ দশমিক ৮৫ ফুট।

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপকূল শিক্ষা বিভাগের চেয়ারম্যান হাফিজ আশরাফুল হক বলছিলেন, পানি নামার পথগুলো ভরাট করে গত এক দশকে ব্যাপক নগরায়ণ হয়েছে। ফলে পানি নদী-নালায় সহজে যাচ্ছে না। আগে চারদিকে অনেক জলাধার ছিল, মাটি অনেক বেশি পানি শুষে নিত। এখন সেসবও কমে গেছে। নদীর তলদেশ পলি জমে ভরাট হয়ে বেসিন সংকুচিত হয়েছে। এসবের দীর্ঘমেয়াদি কুফল ভোগ করছে উপকূলের মানুষ।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন