‘বাড়িতে রান্নার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, হঠাৎ খবর পেলাম, আলমকে মেরে ফেলছে’

রাজশাহীর মোহনপুরে ভ্যানচালক আলম মোল্লাকে পিটিয়ে হত্যার পর পরিবারে মাতম চলছে। শুক্রবার বিকেলে মোহনপুর উপজেলার বেলগাছি গ্রামেছবি: প্রথম আলো

‘আমার ছাওয়াল তো কারও সাথে লাগা জানে না। থাপ্পড় দিলেও কিছু বলে না, বাড়ি চলে আসে। আর সেই ছাওয়ালকেই মেরে ফেলল।’ রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার বেলগাছি গ্রামের নিজ বাড়ির সামনে বসে কাঁদতে কাঁদতে এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন আলম মোল্লার (৫৩) মা পরিজান বেগম।

আজ শুক্রবার সকালে প্রতিবেশী এক যাত্রীর আঘাতে নিহত হন আলম মোল্লা। এ ঘটনায় অভিযুক্ত মজিবর রহমানকে (৫৫) দুপুর পর্যন্ত স্থানীয় বেলগাছি পাঠক ক্লাবে আটকে রাখা হয়। পরে দুপুরে পুলিশ ক্ষিপ্ত এলাকাবাসীকে শান্ত করে মজিবরকে আটক করে নিয়ে যায়। নিহত আলম ওই এলাকার আশরাফের ছেলে। আর মজিবর একই এলাকার পিয়ার দফাদারের ছেলে।

পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিদিনের মতো ভোরে ভ্যানে পাশের তানোর উপজেলার কালীগঞ্জ হাটে সবজি বহন করে নিয়ে যান আলম। হাট থেকে আসার সময় মজিবর রহমান আলমের ভ্যানে ওঠেন। মজিবরের বাড়ির আগেই আলমের বাড়ি। আলম তাঁর বাড়ির সামনে মজিবরকে নামিয়ে দেন। এতে একপর্যায়ে ক্ষিপ্ত হয়ে আলমকে আঘাত করেন মজিবর। এতে আলম মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। পরে তাঁকে মোহনপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। পরিবারের দাবি, আলমকে ইটের আঘাতে হত্যা করা হয়েছে।

আরও পড়ুন

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এ ঘটনার পর এলাকাবাসী মজিবরকে মারধর করে বেলগাছি পাঠক ক্লাবে আটকে রাখেন। সেখানে স্থানীয় লোকজন জড়ো হন। একপর্যায়ে সেখানে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে মোহনপুর থানার পুলিশ সেখানে ঘিরে রাখে। পরে বেলা একটার দিকে পুলিশ মজিবরকে ক্লাব থেকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়।

বেলা একটার দিকে সরেজমিনে দেখা যায়, মানুষ ক্লাবটি ঘিরে রেখেছে। কেউ কেউ পুলিশকে উপেক্ষা করে ক্লাবের দরজা পর্যন্ত চলে যাচ্ছেন। একপর্যায়ে সেখানে কয়েক দফা ধস্তাধস্তিও হয়। পরে স্থানীয় কয়েকজনের সহযোগিতায় পুলিশ মজিবরকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও প্রতিবেশী বিউটি বেগম বলেন, ‘আমরা মজিবরকে ধরার পর সে ধস্তাধস্তি করে পালানোর চেষ্টা করছিল। পরে আহত আলমকে আমরা উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠাই। এ সময় মজিবরের হাতে ইট ছিল।’ প্রত্যক্ষদর্শী আরেক নারী বলেন, ‘আমি চিৎকার দিছি, আলম কাকা মারা গেছে। তখন সবাই দৌড়ে আসছে।’
আলম ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তাঁকে হারিয়ে দিশাহারা পরিবার। গ্রামে বাড়ির পাশেই ওয়াজ মাহফিল উপলক্ষে আলম নিজের আত্মীয়স্বজনকে বাড়িতে দাওয়াত করেছিলেন। কিন্তু এক ঘটনায় সবকিছু থেমে গেছে। আলমের মা পরিজান বেগম বলছিলেন, ‘ব্যাটার বাড়িতে আজকে দাওয়াত আছিল। বলছিল, সবাই মিলে খাব। কিন্তু সেই খাওয়া আর হলো না।’

নিহত আলমের স্ত্রী জরিনা বেগম বলেন, ‘আমরা তখন বাড়িতে রান্নার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। হঠাৎ খবর পেলাম, আলমকে মেরে ফেলছে। গিয়ে দেখি, আমার স্বামী আর নেই। আমি মজিবরের ফাঁসি চাই।’

স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মজিবর এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বিস্তার করে আসছিলেন এবং বিভিন্ন সময় মানুষকে মারধর করেছেন।

এর আগে মারধরের শিকার ভুক্তভোগী মো. হেলাল বলেন, ‘আমাকে একদিন মেরেছিল। পরে ক্লাবে বিচার করে জরিমানা করা হয়েছিল। এরা টাকার গরম আর জমিজমার দাপটে চলে। এলাকায় অনেককে মেরেছে। কথায় কথায় গায়ে হাত তোলে। এ কারণে মানুষ তার ওপর ক্ষিপ্ত।’

মোহনপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মিজানুর রহমান বলেন, স্থানীয় জনগণ মজিবরকে ঘিরে রেখেছিলেন। তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তাঁকেও মারধর করা হয়েছে। মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য রাজশাহী মেডিকেল কলেজে পাঠানো হয়েছে। নিহত ব্যক্তির ছেলে মো. নয়ন বাদী হয়ে হত্যা মামলা করেছেন। মামলায় তিনজনকে আসামি করা হয়েছে।