পেলে থেকে নেইমার, চট্টগ্রামের এক গলিতেই ব্রাজিল ফুটবলের গল্প
সরু একটি গলি। দুই পাশে সাধারণ বাড়িঘর। কোথাও টিনের চালা। কোথাও পুরোনো দেয়াল। মাথার ওপর জট পাকানো বিদ্যুতের তার। প্রথম দেখায় এটিকে চট্টগ্রাম নগরের আর দশটি গলির মতোই মনে হবে। কিন্তু একটু ভেতরে ঢুকতেই দৃশ্য পাল্টে গেল। দেয়ালজুড়ে সবুজ-হলুদ রঙের ছড়াছড়ি। কোথাও পেলে। কোথাও রোমারিও। কোথাও রোনালদিনিও। কোথাও নেইমার। মাথার ওপর উড়ছে ব্রাজিলের পতাকা।
মুহূর্তেই মনে হয়, চট্টগ্রামের চান্দগাঁওয়ের খতিব পাড়ায় নয়, যেন চলে এসেছেন হাজার মাইল দূরের কোনো ব্রাজিলিয়ান মহল্লায়। যে গলিটি এমন রঙিন হয়ে উঠেছে, সেটির নামও বদলে গেছে। স্থানীয় লোকজন এখন একে এখন ডাকছেন ‘ব্রাজিল গলি’ নামে।
ফুটবল বিশ্বকাপকে ঘিরে স্থানীয় সমর্থকদের উদ্যোগে তৈরি হয়েছে এই গলি। বিশ্বকাপের বাঁশি বাজার পর থেকেই এখানে ভিড় বাড়ছে। কেউ ছবি তুলতে আসছেন। কেউ প্রিয় ফুটবলারের প্রতিকৃতি দেখতে। কেউ আবার শুধুই ফুটবলের উৎসবটুকু কাছ থেকে অনুভব করতে।
সরেজমিনে দেখা গেল, আধা কিলোমিটারের গলিটির প্রবেশমুখ থেকেই শুরু হয়েছে রঙের উৎসব। বাতাসে উড়ছে ৩৬ ফুট লম্বা ও ১৬ ফুট চওড়া ব্রাজিলের পতাকা। দেয়ালজুড়ে ফুটে উঠেছে ব্রাজিল ফুটবলের নানা অধ্যায়। বর্তমান দলের ২৬ ফুটবলারের নাম ও জার্সি নম্বরও স্থান পেয়েছে সেখানে।
এক দেয়ালে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছেন রোমারিও, পেলে, রোনালদিনিও ও নেইমার। অন্য দেয়ালে বর্তমান ও সাবেক তারকাদের প্রতিকৃতি। কোথাও বড় করে লেখা ‘সেলেসাও’। কোথাও বিশ্বকাপ ট্রফি। সব মিলিয়ে পুরো গলিটাই যেন একটি খোলা আকাশের নিচের ফুটবল জাদুঘর।
গলি ধরে একটু সামনে এগোতেই চোখে পড়ে অন্য এক দৃশ্য। একটি বাড়ির জানালার দুই পাশে আঁকা হয়েছে বিশ্বকাপ ট্রফি ও ব্রাজিলের জার্সি পরা এক ফুটবলারের ছবি। মাঝখানের গ্রিল ধরে বাইরে উঁকি দিচ্ছে একটি শিশু। কৌতূহলী চোখে দেখছে চারপাশ। বিশ্বকাপের উন্মাদনা যে বড়দের গণ্ডি পেরিয়ে শিশুদের মনেও জায়গা করে নিয়েছে, দৃশ্যটি যেন তারই প্রতীক।
আরেকটি দেয়ালের সামনে গিয়ে চোখ আটকে যায়। সেখানে পাশাপাশি আঁকা হয়েছে ফুটবল ইতিহাসের দুই মহাতারকা পেলে ও ডিয়েগো ম্যারাডোনাকে। মাঠে তাঁরা কখনো একই দলে খেলেননি। কিন্তু এই দেয়ালে দুজন দাঁড়িয়ে আছেন পাশাপাশি। যেন ফুটবল শেষ পর্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার নয়, সৌন্দর্যেরই নাম। আরেক দেয়ালে দেখা যায় মেসি, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ও নেইমারকে। তিনজনের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার ছবির পাশে লেখা—‘দ্য এন্ড’।
গলির ভেতর হাঁটার সময় হঠাৎ দেখা গেল আর্জেন্টিনার জার্সি পরা এক শিশু দৌড়ে চলে গেল ব্রাজিল সমর্থকদের সাজানো পথ ধরে। আশপাশের কয়েকজন হেসে উঠলেন। কেউ কিছু বললেন না। ফুটবল মাঠে বিভক্ত করতে পারে। কিন্তু এই গলিতে এসে মনে হয়, শেষ পর্যন্ত ফুটবলই সবাইকে এক জায়গায় এনে দাঁড় করায়।
এই আয়োজনের মূল উদ্যোক্তা স্থানীয় বাসিন্দা রনি সাজ্জাদ। তিনি বলেন, ‘ছোটবেলা থেকে ব্রাজিলের খেলা দেখি। বিশ্বকাপ এলেই এই গলিটা আমাদের কাছে আলাদা হয়ে ওঠে। ২০১০ সাল থেকে আমরা দেয়ালগুলো রাঙাচ্ছি। এবারও সবাই মিলে করেছি। শুধু ব্রাজিল নয়, ফুটবলের প্রতি শ্রদ্ধা থেকেই মেসি, রোনালদো, ম্যারাডোনা—সবাইকে জায়গা দেওয়া হয়েছে। ফুটবল তো শেষ পর্যন্ত সবার।’
দেয়ালচিত্রগুলো এঁকেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী নয়ন পাল। মজার বিষয় হলো, তিনি নিজে আর্জেন্টিনার সমর্থক। হেসে হেসে নয়ন বলেন, ‘সমর্থন এক জিনিস, শিল্প আরেক জিনিস। বিশ্বকাপ এলেই চারদিকে একটা উৎসবের আবহ তৈরি হয়। সেই আবহকে রঙে-তুলিতে ফুটিয়ে তোলার সুযোগ পেয়েছি। খতিবপাড়ার এই গলিটা এখন মানুষের নজর কাড়ছে। ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসকে দেয়ালে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।’
‘মরক্কোকে হারিয়ে মিশন শুরু করবে ব্রাজিল’
গলির এক পাশে দাঁড়িয়ে মোবাইল ফোনে ছবি তুলছিলেন কয়েকজন তরুণ। তাঁদের পেছনে নেইমারের বিশাল প্রতিকৃতি। তাঁদের একজন মোহাম্মদ হুমায়ুন। ব্রাজিলের জার্সি পরা এই তরুণের কণ্ঠে আত্মবিশ্বাস। তিনি বলেন, ‘কোচ কার্লো আনচেলত্তির অধীনে দলটা অন্য রকম লাগছে। খেলোয়াড়দের মধ্যে আত্মবিশ্বাস আছে। এবার অনেক দূর যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। আমার বিশ্বাস, প্রথম ম্যাচেই মরক্কোকে হারিয়ে বিশ্বকাপ মিশন শুরু করবে ব্রাজিল।’
স্থানীয় তরুণ রায়হান ইসলামের চোখেও একই স্বপ্ন। তিনি বলেন, ‘বিশ্বকাপ আমাদের কাছে শুধু খেলা নয়, একটা আবেগ। চার বছর ধরে আমরা এই সময়টার জন্য অপেক্ষা করি। এবার আক্রমণ, মাঝমাঠ, রক্ষণ—সব জায়গায় ভারসাম্য আছে। আমার মনে হয়, ব্রাজিলের ষষ্ঠ শিরোপার অপেক্ষা এবার শেষ হবে।’
কথা হয় প্রবীণ বাসিন্দা আবদুল কাদেরের সঙ্গে। তাঁর বাড়ির ছাদেও উড়ছে ব্রাজিলের পতাকা। হালকা হাসি দিয়ে তিনি বলেন, ‘বিশ্বকাপ শুধু ৯০ মিনিটের খেলা নয়। এটা মানুষের স্মৃতির অংশ। আনন্দের অংশ। দেখেন না, একটা গলি কীভাবে বদলে গেছে! মানুষ আসছে, ছবি তুলছে, গল্প করছে। এটাই তো বিশ্বকাপের সৌন্দর্য।’
আগামী রোববার ভোরে মরক্কোর বিপক্ষে মাঠে নামবে ব্রাজিল। দেশের লাখো সমর্থকের মতো খতিবপাড়ার মানুষও এখন অপেক্ষায়। ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, রাফিনিয়া, মারকিনিওসরা কেমন খেলবেন, সেটি সময়ই বলে দেবে। তবে ফল যা-ই হোক, খতিবপাড়ার এই গলি ইতিমধ্যে ব্রাজিলের সমর্থকদের মধ্যে পরিচিতি পেয়েছে।