ডায়রিয়ায় আক্রান্ত ১১ মাস বয়সী মেয়ে তাসফিয়া জান্নাতকে নিয়ে দুই দিন ধরে পঞ্চগড় আধুনিক সদর হাসপাতালে আছেন শেফালী আক্তার। শয্যা না পেয়ে হাসপাতালের দ্বিতীয় তলার বারান্দার মেঝেতে থেকে চিকিৎসা নিচ্ছে শিশুটি। অতিরিক্ত রোগীর চাপে মেঝেতে গাদাগাদি করে থাকার পাশাপাশি মানুষের চলাচলে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে তাঁদের।
শুধু শেফালী আক্তার নন, শয্যাসংকটে পঞ্চগড় আধুনিক সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা অধিকাংশ রোগীকে মেঝে ও বারান্দায় থেকে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। শয্যাসংকটের পাশাপাশি চিকিৎসক–সংকটে বেশির ভাগ জরুরি রোগীকেই রংপুর ও দিনাজপুরের হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে। অথচ হাসপাতাল সম্প্রসারণে নির্মাণ করা নতুন ৯ তলা ভবনটি অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে।
শয্যাসংকট কমানো ও চিকিৎসাসেবার মানোন্নয়নে পঞ্চগড় আধুনিক সদর হাসপাতালকে ২৫০ শয্যায় রূপান্তরের জন্য ২০১৭ সালে ৯ তলাবিশিষ্ট ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০২৪ সালের জুনে আটতলা পর্যন্ত কাজ করে ভবনটি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করে গণপূর্ত বিভাগ। পরে নবম তলায় আইসিইউ ও আইসোলেশন ইউনিট এবং লিফট স্থাপনের কাজ শেষ হয়েছে, যা এখন আনুষ্ঠানিক হস্তান্তরের অপেক্ষায়। নবনির্মিত ভবনটিতে রোগীদের জন্য তৈরি করা ওয়ার্ড ও কেবিনগুলো পড়ে থাকতে দেখা গেছে।
জেলা শহরের প্রাণকেন্দ্রে স্থাপিত হাসপাতালটিতে প্রতিদিন বহির্বিভাগে প্রায় দেড় হাজার রোগী সেবা নিয়ে থাকেন। অন্তর্বিভাগে ভর্তি থাকেন ২৫০ থেকে ২৯০ জন। ১০০ শয্যা হওয়ায় প্রায় সময়ই অন্তত ১৮০ জন রোগীকে মেঝেতে রেখে চিকিৎসাসেবা দিতে গিয়ে হিমশিম খেতে হয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে। আজ বুধবার বেলা একটা পর্যন্ত বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছেন ১ হাজার ৪১৭ জন। তাঁদের মধ্যে ৩১৫ জন পুরুষ, ৭৭৪ জন নারী ও ৩২৮ জন শিশু। অন্যদিকে নারী-শিশু ও পুরুষ মিলিয়ে ভর্তি ছিলেন ২৯৭ জন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৯৮৪ সালে পঞ্চগড়কে জেলা ঘোষণার পর পঞ্চগড় স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করে পঞ্চগড় সদর হাসপাতাল করা হয়। ২০০৫ সালে হাসপাতালটি ১০০ শয্যায় উন্নীত করে আধুনিক সদর হাসপাতালে পরিণত হয়। এর পর থেকে চিকিৎসকসহ প্রয়োজনীয় জনবল-সংকট আজও কাটেনি। বর্তমানে হাসপাতালে ৬৩ জন চিকিৎসকের পদ থাকলেও কর্মরত আছেন মাত্র ১৫ জন।
হাসপাতালের পুরোনো ভবনে শয্যা–সংকুলান না হওয়ায় জেলাবাসীর দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সব রাজনৈতিক দলের নেতাদের নিয়ে গত বছরের ১৮ অক্টোবর হাসপাতালের নতুন ভবন চালুর বিষয়ে একটি সভা করেন পঞ্চগড়ের তৎকালীন জেলা প্রশাসক। সেখানে জেলা স্বাস্থ্য সহায়তা তহবিল গঠন করে তা পরিচালনার জন্য ১৭ সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করা হয়। খোলা হয় ব্যাংক হিসাবও। এর পর থেকে জেলার বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও বিত্তবান ব্যক্তিরা ওই তহবিলে প্রায় ২৩ লাখ টাকা অনুদান জমা দেন। তারপরও অর্থসংকটে চালু করা যায়নি হাসপাতালের নতুন ভবনটি।
হাসপাতালের নারী মেডিসিন ওয়ার্ডের বারান্দার মেঝেতে শুয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন সদর উপজেলার মডেলহাট এলাকার ডায়রিয়ায় আক্রান্ত আছিয়া বেগম (৪০)। তিনি বলেন, ‘হাসপাতালে ভর্তি হয়ে দেখি, কোনো সিট (শয্যা) নেই। বারান্দায় অনেক রোগীর ঠাসাঠাসি। উপায় নেই দেখে এখানেই থাকতে হচ্ছে।’
পঞ্চগড়ের সিভিল সার্জন মো. মিজানুর রহমান বলেন, স্বাস্থ্যসহায়তা তহবিলে জমা হওয়া ২৩ লাখ টাকার মধ্যে ১৩ লাখ টাকা দিয়ে ইতিমধ্যে ইসিজি মেশিন, বেড, চেয়ার-টেবিল, ট্রলিসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম কেনা হয়েছে। এ ছাড়া হাসপাতালের নতুন ভবনটি চালুর জন্য প্রতিনিয়তই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। সেই সঙ্গে মন্ত্রণালয় থেকেও কর্মকর্তারা বারবার খোঁজ নিচ্ছেন। খুব দ্রুত নতুন ভবনটি চালু হবে বলে আশা করছেন তিনি।