সিঁড়ি ছাড়াই বিদ্যালয়ের দোতলা ভবন নির্মাণ

নির্মিত ভবনের দোতলায় ওঠার সিঁড়ি না থাকায় প্রায় চার বছর ধরে কার্যত অচল হয়ে পড়ে আছে পুরো দোতলা।

সিঁড়ি ছাড়াই দোতলা ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। ফলে দোতলা আর ব্যবহার করা যাচ্ছে না। ৬ মে দুপুরে রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার তালতলা সপ্তপল্লী মাধ্যমিক বিদ্যালয়েছবি: প্রথম আলো

রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার তালতলা সপ্তপল্লী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের একাডেমিক ভবনের সিঁড়ি ছাড়াই বর্ধিত দ্বিতীয় তলা নির্মাণ করা হয়েছে। ৩৭ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত ভবনের দোতলায় ওঠার ব্যবস্থা না থাকায় প্রায় চার বছর ধরে কার্যত অচল হয়ে পড়ে আছে পুরো দোতলা। বাধ্য হয়ে চারটি ক্লাসের শিক্ষার্থীরা নিচতলায় দুটি ক্লাসে গাদাগাদি করে বসায় পাঠদান চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

বিদ্যালয়টির সহকারী শিক্ষক সমিতা বিশ্বাস বলেন, কক্ষসংকট দূর করতে জেলা পরিষদ ও শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর থেকে কয়েক দফা বরাদ্দ এনে দোতলা ভবনের কাজ করা হয়। দোতলায় দুটি শ্রেণিকক্ষসহ ছাদ সম্পন্ন হলেও সিঁড়ি না থাকায় সেটা কোনো কাজে আসছে না।

৬ মে সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বালিয়াকান্দি সদর উপজেলার তালতলা গ্রামে প্রায় ৬৬ শতক জমিতে ১৯৯৯ সালের ১ জানুয়ারি স্থাপিত হয় বিদ্যালয়টি। পরে আরও ১০ শতক জমি কিনে ৭৬ শতক জমিতে দুটি টিনের ঘরের একটিতে শিক্ষকদের বসার এবং অপর কক্ষে শ্রেণি পাঠদান চলে। পরবর্তী সময়ে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর থেকে তিন কক্ষবিশিষ্ট একতলা প্রশাসনিক ভবন নির্মাণ করা হয়। এর একটিতে প্রধান শিক্ষক, অফিস সহকারী ও শিক্ষকদের বসার জায়গা এবং অপর কক্ষে কম্পিউটার ল্যাব চালু করা হয়। টিনশেড ঘর দুটিতে পাঠদান কার্যক্রম চালু রাখা হয়। বিদ্যালয়ের ২৩৫ জন শিক্ষার্থী পাঠদানের জন্য প্রধান শিক্ষকসহ ১২ জন শিক্ষক এবং ৬ জন কর্মচারী আছেন।

বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক কৃষ্ণবন্ধু রায় বলেন, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে জেলা পরিষদের অর্থায়নে ৭ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রশাসনিক ভবনের পাশে প্রায় চার শতক জমিতে দোতলা একাডেমিক ভবন নির্মাণকাজ শুরু হয়। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর থেকে আরও ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ মিললে ভবনের নিচতলার দুটি কক্ষসহ আংশিক কাজ করা হয়। ২০২০-২১ অর্থবছরে জেলা পরিষদ থেকে আবার ১০ লাখ টাকা অর্থ বরাদ্দ পাওয়া গেলে নিচতলার কাজ সম্পন্ন করা হয়। কক্ষ স্বল্পতার কারণে নিচতলার দুটি কক্ষের ভেতর বাঁশের চাঁটাইয়ের বেড়া দিয়ে অস্থায়ী চারটি কক্ষ করে সপ্তম থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের পাঠদান করা হয়।

বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, দোতলার বর্ধিত অংশ সম্প্রসারণে জেলা পরিষদে অর্থ বরাদ্দ চেয়ে আবেদন করলে ২০২১-২২ অর্থবছরে ১৫ লাখ টাকা বরাদ্দ পাওয়া যায়। ওই টাকা দিয়ে ভবনের দ্বিতীয় তলায় কাজ করে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু সিঁড়ি না করেই দ্বিতীয় তলার দুটি কক্ষ এবং ছাদ তৈরি করে চার বছর ধরে ফেলে রাখা হয়েছে। ফলে শিক্ষার্থীরা এই ভবনের কোনো সুফল পাচ্ছে না। সিঁড়িসহ আনুষঙ্গিক কাজ সম্পন্ন করতে আবার বরাদ্দের জন্য ৬ মে জেলা পরিষদের প্রশাসকের কাছে আবেদন করা হয়েছে।

বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী তন্ময় রায় বলে, ‘দোতলা ভবনের সিঁড়ি না থাকায় এক কক্ষের মধ্যে বাঁশের বেড়া দিয়ে পার্টিশন করে গাদাগাদি করে আমাদের ক্লাস করতে হয়। এ ছাড়া বিদ্যালয়ের টিউবওয়েল নেই, খেলার মাঠ অনেক নিচু হওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতে পানিতে ভরে যায়।’

দোতলা ভবনে আপাতত যে অবস্থা, তাতে ক্লাস নেওয়া সম্ভব ছিল। কিন্তু সিঁড়ি না থাকায় ক্লাস নেওয়া সম্ভব হয় না। চার বছর ধরে পড়ে আছে দোতলা।
তুষার কান্তি রায়, সহকারী শিক্ষক

বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিষয়ের সহকারী শিক্ষক তুষার কান্তি রায় বলেন, দোতলা ভবনে আপাতত যে অবস্থা, তাতে ক্লাস নেওয়া সম্ভব ছিল। কিন্তু সিঁড়ি না থাকায় ক্লাস নেওয়া সম্ভব হয় না। চার বছর ধরে পড়ে আছে দোতলা।  দ্রুত তাঁরা এই সংকটের সমাধান চান।

সিঁড়ি ছাড়া দোতলা ভবনের কাজের বিষয়টি কয়েক মাস আগে জেনেছেন বালিয়াকান্দি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) চৌধুরী মুস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, দ্রুত ব্যবস্থা নিতে উপজেলা পরিষদ থেকে চেষ্টা করা হচ্ছে। পাশাপাশি শিক্ষা মন্ত্রণালয়েও অর্থ বরাদ্দের চাহিদা জানিয়ে আবেদন জানানো হয়েছে।

শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপসহকারী প্রকৌশলী মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, সম্প্রতি বিষয়টি তাঁদের গোচরে আসায় খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, জেলা পরিষদের ঠিকাদারের ভুলের মাশুল দিতে হচ্ছে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের। তাদের জানালে হয়তো ভুলটি হতো না। এ ঘটনায় স্থানীয় সংসদ সদস্যের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন তিনি।

রাজবাড়ী জেলা পরিষদের প্রশাসক আবদুস সালাম মিয়া বলেন, ‘আমি সবে দায়িত্ব নিয়েছি। ফাইলপত্র দেখে খোঁজখবর নিয়ে সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’