ভারতের পতাকার ওপর হেঁটে বাংলাদেশেরই ক্ষতি হচ্ছে: আনু মুহাম্মদ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য আনু মুহাম্মদ বলেছেন, ভারতের পতাকার ওপর দিয়ে হেঁটে গিয়ে নিজের মধ্যে একটা আনন্দ হতে পারে। কিন্তু এটা যারা করছে, তারা বাংলাদেশেরই বড় ধরনের ক্ষতি করছে। ভারতের পতাকার ওপর দিয়ে হেঁটে গিয়ে ভারতের ক্ষতি হচ্ছে না, বরং ভারতের যারা বাংলাদেশবিরোধী চক্রান্ত করছে, তাদের জন্য একটি নতুন পুঁজির সরবরাহ করা হলো। তাদের হাতে একটি অস্ত্র তুলে দেওয়া হলো। এ ধরনের কাজ করে ভারতবিরোধিতা হবে না।
আজ বুধবার সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী ভবনের ফোকলোর গ্যালারিতে ‘রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক সংস্কার: সম্ভাবনা ও সংকট’ শীর্ষক আলোচনা সভায় আনু মুহাম্মদ এ কথাগুলো বলেন।
আনু মুহাম্মদ আরও বলেন, ভারতের আধিপত্যবাদের বিরোধিতা করতে হলে ভারতের সঙ্গে হওয়া চুক্তি নিয়ে কথা বলতে হবে। কারণ, শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘আমরা যা দিয়েছি, ভারত তা চিরদিন মনে রাখবে।’ তিনি আসলে কী কী দিয়েছেন এবং চুক্তি করেছেন, সেই তথ্য-উপাত্ত যেহেতু বর্তমান সরকারের কাছে রয়েছে, সেটি দেশের জনগণের কাছে প্রকাশ করতে হবে। তার মধ্যে যেগুলো জাতীয় স্বার্থবিরোধী, সেগুলো কীভাবে বাতিল করা যায়, সেই পথ তৈরি করতে হবে।
বাংলাদেশের হিন্দুদের প্রতি ভারতের প্রেমকে একটি অস্ত্র উল্লেখ করে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর অত্যাচার হচ্ছে, এটা ভারতের একটি অস্ত্র। তাদের দেশের হিন্দুরা কী অবস্থায় রয়েছে? পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক গরিব বাস করে ভারতে। আর এদের সংখ্যাগরিষ্ঠ হচ্ছে হিন্দু। তাদের জন্য ভারত সরকার কী করেছে? ভারতের কাশ্মীর, অন্ধ্র প্রদেশ, আসামসহ মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সামরিক শাসনে রয়েছে। তাদের ধর্মও তো হিন্দু। তুমি নির্যাতন করছ, শোষণ করছ, তাদের না খাইয়ে রাখছ। অথচ তোমার কাছে মনে হচ্ছে, তুমি বাংলাদেশের হিন্দুদের প্রতি প্রেমাসক্ত। এটা তো তোমার আসল প্রেম নয়, এটা তোমার অস্ত্র।’ বাংলাদেশ নিয়ে ভারতের অপপ্রচার রোধে একটি সেল গঠন করা উচিত বলেও মন্তব্য করেন আনু মুহাম্মদ।
আওয়ামী শাসনামলে মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির কথা বলা হলেও এর মধ্য দিয়ে মূলত বৈষম্যই বেড়েছে মন্তব্য করে আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘বৈষম্যহীন বাংলাদেশ তো অনেক বড় বিষয়। বৈষম্যহীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠাই গণতান্ত্রিক রূপান্তরের মূল জিনিস। গত ১৫ বছরে এত জিডিপি বাড়ল, স্বল্পোন্নত দেশে থেকে আমরা মুক্ত হয়েছি বলে নানা জায়গায় আতশবাজি ফোটানো হলো, মাথাপিছু আয় বাড়তে বাড়তে এক লাখ টাকার বেশি হলো। এই সময়ে মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির অন্তরালে মূলত বৈষম্যই বেড়েছে।’
প্রত্যেক সরকারই ক্ষমতায় এসে সংবিধানকে বৈষম্যবাদীতে পরিণত করেছে উল্লেখ করে আনু মুহাম্মদ আরও বলেন, ‘আমাদের সংবিধানেই অনেক বৈষম্যবিরোধী কথাবার্তা আছে। কিন্তু কোনো সরকারই সেটি নিয়ে কাজ করেনি। প্রত্যেকটি সরকারই এই সংবিধান লঙ্ঘন করেছে। সংবিধানের মধ্যে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের কারণে বৈষম্য নিপীড়নের বিরুদ্ধে মৌলিক অধিকারের পক্ষে অনেক ধারা আছে। পরে একেকটা সরকার এসেছে এবং তার নিজের শ্রেণি ও ক্ষমতার স্বার্থে সংশোধন করতে করতে এই সংবিধানকে স্বৈরতন্ত্রী, সাম্প্রদায়িক ও বৈষম্যবাদীতে পরিণত করেছে।’
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সংগঠন ‘মুক্তাঙ্গন’ আয়োজিত এ আলোচনা সভার প্রথম পর্বে ‘ছাত্র প্রতিনিধিদের বোঝাপড়া’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সাংবাদিক সংগঠনের প্রতিনিধি। দ্বিতীয় পর্বে আলোচক হিসেবে আলোচনা করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ফোকলোর বিভাগের অধ্যাপক সুস্মিতা চক্রবর্তী ও ইতিহাস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক গোলাম সারোয়ার। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন দর্শন বিভাগের শিক্ষার্থী আশিকুল্লাহ মুহিব ও শ্রেয়সী রায়।