সাঁতার না–জানা বান্ধবী মোবাশ্বেরাকে বাঁচাতে লেকে ঝাঁপ দেন তাসফিয়া, মারা যান দুজনেই

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষার্থী মোবাশ্বেরা তানজুম ও তাসফিয়া জাহানছবি: সংগৃহীত

পরীক্ষা শেষ করার আনন্দ ছিল। সেই আনন্দের সঙ্গে যোগ হয়েছিল বৃষ্টি। ভিজতে ভিজতে বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকপাড়ে চলে গিয়েছিলেন দুই বান্ধবী। কে জানত, সেখানেই ওত পেতে ছিল ভয়ংকর দুঃস্বপ্ন। ঢালু লেকপাড় আর বৃষ্টির কারণে পা পিছলে পানির মধ্যে পড়ে যান একজন। বান্ধবীকে বাঁচাতে লেকে ঝাঁপ দেন অন্যজন। দুজনেরই প্রাণ যায় লেকের পানিতে ডুবে।

এই দুজন হলেন গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বশেমুরবিপ্রবি) শিক্ষার্থী মোবাশ্বেরা তানজুম (হিয়া) ও তাসফিয়া জাহান (ঋতু)। দুজনই পরিবেশবিজ্ঞান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। দুজন বন্ধু ও রুমমেট।

আরও পড়ুন

গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এ ঘটনা ঘটে। এরপর সন্ধ্যায় মোবাশ্বেরার লাশ আসে খুলনার খালিশপুর বড় বয়রা মধ্যপাড়া এলাকার বাড়িতে। মরদেহ আসার পর থেকে বাড়িতে শত শত মানুষের ভিড়। স্বজন, পাড়াপড়শিরা, স্কুল-কলেজের শিক্ষক, বন্ধুরা সবাই শেষবারের মতো দেখতে আসেন মোবাশ্বেরাকে।

একদিকে নগরের গোয়ালখালি কবরখানায় হিয়ার দাদা-দাদির কবরের পাশে তাঁকে দাফনের প্রস্তুতি চলছিল, অন্যদিকে স্বজনদের কান্না থামছিল না। স্বজন, পাড়াপড়শিরা যারাই আসছিলেন, মোবাশ্বেরার বাবা মো. মনিরুজ্জামান তাঁদের জড়িয়ে ধরে বিলাপ করছিলেন। কখনো কখনো একবারে নিশ্চুপ হয়ে যাচ্ছিলেন।

বিলাপ করতে করতে মো. মনিরুজ্জামান বলছিলেন, ‘আমাদের খুব ইচ্ছে ছিল মেয়েটা ডাক্তার হবে। চেষ্টা করেছিল, কিন্তু হয়নি। গত সপ্তাহে আমাকে বলল, “বাবা জিপিএ–৫ সব সময় পেয়ে আসছি, তারপরও ডাক্তার হতে পারিনি বলে হয়তো তোমার রাগ। দেখো বাবা, নসিবে হয়তো ছিল না। তবে এবার চারের মধ্যে চার পাওয়ার মতো পড়াশোনা করব।”’

গোপালগঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকে ডুবে ছাত্রী মোবাশ্বেরা তানজুমের মৃত্যুর ঘটনায় তাঁর বাবাকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন স্বজনেরা। গতকাল মঙ্গলবার রাতে খুলনার খালিশপুর বড় বয়রা মধ্যপাড়া এলাকায়
ছবি: সাদ্দাম হোসেন

মোবাশ্বেরার সঙ্গে প্রতিদিন সকালে কথা হতো বাবা মনিরুজ্জামানের। নিয়মিত বাড়ি যাওয়া-আসা করতেন তিনি। ক্লাস-পরীক্ষা চলছিল বলে কয়েক দিন খুলনায় আসতে পারেননি। গতকাল তাঁদের ক্লাস-পরীক্ষা শেষ ছিল। মনিরুজ্জামান বলছিলেন, ‘সোমবার রাতে ভিডিও কলে শেষ কথা হয়েছে। ওরা দুই বান্ধবী বুধবার আমার বাসায় আসবে বলে জানিয়েছিল। ওরা একই রুমে থাকত। হলের বাইরে বালুর মাঠের পাশে একটা বাসায় থাকত। গত সপ্তাহে দুজন নতুন বাসায় উঠেছে। আমার মেয়েকে বাঁচাতে গিয়ে ওর বান্ধবী ঋতু (তাসফিয়া জাহান) মারা গেছে। ও যে স্যাক্রিফাইস করছে, সেটা কেউ করে না।’

মোবাশ্বেরা তানজুমেরা দুই ভাই-বোন ছিলেন। তিনি ছিলেন বড়। ছোটবেলা থেকেই তিনি মেধাবী ছাত্রী হিসেবে পরিচিত। খুলনা সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় (মন্নুজান স্কুল) থেকে এসএসসি এবং খুলনা সরকারি মহিলা কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন তিনি। হিয়ার ছোট ভাই তাহমিদ আরাব খুলনা সিটি কলেজে একাদশ শ্রেণিতে পড়ে। বোনের অকালমৃত্যু তাহমিদকে অনেকটাই নির্বাক করে দিয়েছে। অনেকক্ষণ পরপর দু-একটা কথা বলছিল সে।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, গতকাল দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বৃষ্টিতে ভিজছিলেন দুই সহপাঠী মোবাশ্বেরা ও তাসফিয়া। একটি লেকের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ পা পিছলে পড়ে যান সাঁতার না–জানা মোবাশ্বেরা। তাঁকে বাঁচাতে লেকের পানিতে ঝাঁপ দেন তাসফিয়া। দুজন ওপরে উঠতে প্রাণপণ চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে তাঁরা পানিতে ডুবে যান। ঘটনাটি দূর থেকে দেখতে পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী এসে পানিতে ঝাঁপ দেন। প্রায় ৩০ মিনিট পর তাঁদের উদ্ধার করেন শিক্ষার্থীরা। পরে তাঁদের গোপালগঞ্জ ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু হাসপাতালে নেওয়ার আগেই দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে বলে জানান চিকিৎসক।