দুই দৃষ্টিহীন সহোদরের কাঁধে সংসারের ভার, আয়ের পথ দিনমজুরি ও শাকসবজি বিক্রি
সুজন আহমদ (৩০) ও রাজন আহমদ (২৫)—দুই সহোদর তখন বয়সে কিশোর। স্বভাবতই এলাকার অন্য সমবয়সীদের সঙ্গে মেতে থাকতেন দুরন্তপনায়। হঠাৎ করেই তাঁদের দুজনের চোখের আলো একটু একটু করে নিভতে শুরু করে। ধীরে ধীরে হারাতে থাকেন দৃষ্টিশক্তি।
চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারের পরও চোখের আলো আর ফেরেনি। এরই মধ্যে মারা যান তাঁদের বাবা। সংসারে রয়ে যান মা ও সাত ভাই। বড় ভাই বিয়ে করে আলাদা সংসার পাতেন। তখন সুজন ও রাজন ছাড়া বাকি ভাইয়েরা সবাই ছিল ছোট। সংসারের দায়িত্ব এসে পড়ে এই দুই দৃষ্টিহীন সহোদরের কাঁধে।
শারীরিক প্রতিবন্ধিতাকে পাশ কাটিয়ে জীবিকার সন্ধানে নামেন সুজন ও রাজন। দিনমজুরি, শাকসবজি বিক্রি—যে কাজ পান, সেটিই করেন। যা আয় হয়, তা দিয়েই কোনোমতে টেনেটুনে চলে সংসার। এভাবেই বহু দিন ধরে চলছে তাঁদের জীবনসংগ্রাম।
সুজন ও রাজন আহমদ মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার জায়ফরনগর ইউনিয়নের পূর্ব বেলাগাঁও গ্রামের বাসিন্দা মৃত আবদুল খালেকের ছেলে।
উপজেলা সদরের ডাকঘর সড়কের পাশে প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত হাকালুকি হাওর এলাকার বিভিন্ন জাতের মাছ ও শাকসবজির অস্থায়ী বাজার বসে। গত বুধবার সন্ধ্যায় সেখানেই দেখা মেলে সুজন ও রাজনের। কনকনে শীতে গায়ে চাদর জড়িয়ে তাঁরা শিম, ক্ষীরা ও ধনেপাতা বিক্রি করছিলেন। কেউ কেউ দরদাম করে সবজি কিনে নিচ্ছিলেন। চোখে না দেখতে পারায় ওজন মাপা ও টাকা গোনার কাজে পাশের দোকানিরা তাঁদের সহায়তা করছিলেন।
কাজের ফাঁকে ফাঁকে কথা হয় সুজন ও রাজনের সঙ্গে। একসময় তাঁদের থাকার মতো ঘরও ছিল না। পূর্ব বেলাগাঁও গ্রামের বাসিন্দা আলফাজ আলী নিজের বাড়িতে তাঁদের আশ্রয় দেন। বাবা আবদুল খালেক দিনমজুরের কাজ করতেন। দীর্ঘদিনের জমানো টাকা দিয়ে একই এলাকায় ১৫ শতক জমি কিনে ঘর তুলেছিলেন। কয়েক বছর পর ২০২২ সালে তিনি মারা যান।
সুজন লেখাপড়া করতে পারেননি। রাজন স্থানীয় পূর্ব বেলাগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছেন। প্রথমে সুজনের চোখে সমস্যা দেখা দেয়, পরে রাজনের। তখন বাবা জীবিত ছিলেন। দুই ছেলের চিকিৎসায় তিনি সর্বস্ব ব্যয় করেন। মৌলভীবাজার শহরের মাতারকাপন চক্ষু হাসপাতালে তাঁদের অস্ত্রোপচার হয়। তবু চোখের আলো ফেরেনি।
রাজন বলেন, ‘আব্বা মারা গেলেন। বড় ভাই বিয়া করে আলাদা হয়ে গেলেন। মায়েরে নিয়া বাকি ছয় ভাই থাকলাম। বাকি চাইর ভাইয়ের তখন বয়স কম। সংসার তো চলা লাগে। বড় হওয়ায় আমরা (রাজন ও সুজন) দায়িত্ব নিলাম। চোখের আলো নাই, মনের আলো তো আছে। যে সময় যে কাম পাই, করি। লগে এখন ছোট ভাই জাইদুলও কাম করে। মাটি কাটি, আওরে (হাকালুকি হাওর) মাছ ধরি, তরকারি কিনি আনিয়া বেচি। এই কাজ করি রোজ একজনে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা পাই।’
সুজন ও রাজন জানান, কয়েক বছর ধরে সরকার থেকে মাসিক প্রতিবন্ধী ভাতা পাচ্ছেন। দেড় বছর আগে সুজনের বিয়ে হয়েছে। তাঁর পাঁচ মাস বয়সী একটি ছেলেও আছে।
সুজন ও রাজন আরও বলেন, প্রায় এক বছর আগে বেসরকারি সংস্থা ও আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে প্রায় চার লাখ টাকা ধার নিয়ে এক দালালের মাধ্যমে তাঁদের চতুর্থ ভাই হোসাইনকে কাতারে পাঠান। সেখানে গিয়ে হোসাইন কাজ পাননি। দালাল তাঁদের সঙ্গে প্রতারণা করেছে। এখন হোসাইন না পারছেন দেশে ফিরতে, না পারছেন সেখানে টিকে থাকতে। দালালের সঙ্গেও যোগাযোগ নেই। ধার করা টাকা কীভাবে শোধ করবেন, তা নিয়েই দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে তাঁদের।
ডাকঘর সড়ক এলাকার মুদিদোকানি ও কামিনীগঞ্জ বাজার ব্যবসায়ী সমিতির নেতা ইলিয়াছুর রহমান ময়না বলেন, ‘সুজন ও রাজন খুব পরিশ্রমী। ইচ্ছাশক্তি থাকলে শারীরিক প্রতিবন্ধকতা যে কোনো বাধা হতে পারে না—ওরা তার বড় উদাহরণ। বাজারে এলে আমরা যতটা পারি সহযোগিতা করি।’