আগের মতো লুঙ্গি-গামছা বিক্রি হয় না রশিদের
‘ও সাথি একবার এসে দেখে যাও, আমি কেমন লুঙ্গি বেচি। সুন্দর সুন্দর লুঙ্গি আনছি লওনা একবার কিনি, কুচা দিয়ে পরলে পরে সুন্দর দেখা যাবি। ও সাথি একবার এসে দেখে যাও, আমি কেমন লুঙ্গি বেচি।’
এভাবে রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ও মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া নৌপথে চলাচলরত ফেরিতে গানে গানে যাত্রীদের কাছে লুঙ্গি বিক্রি করেন পাবনার আবদুর রশিদ মীর (৪৮)। পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর এই নৌপথে যাত্রী কমেছে। ফলে এখন আর আগের মতো লুঙ্গি–গামছা বিক্রি হয় না এই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর।
একেকটি লুঙ্গি মানভেদে ২৫০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা, গামছা ১৫০ টাকা থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করেন জানিয়ে আবদুর রশিদ মীর বলেন, পদ্মা সেতু চালু হওয়ার আগে ফেরিতে প্রতিদিন সাড়ে পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকা বিক্রি করতেন। দিন শেষে তাঁর আয় হতো পাঁচ শ থেকে ছয় শ টাকা। এখন বিক্রি অনেক কমেছে।
এর কারণ জানিয়ে আবদুর রশিদ বলেন, আগে দৌলতদিয়া ও পাটুরিয়া দুই ঘাটে শত শত পণ্যবাহী ট্রাক, কার্ভাড ভ্যানসহ অন্যান্য গাড়ি ফেরি পারের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষায় থাকত। এসব গাড়ির চালক ও সহকারীরা লুঙ্গি-গামছা কিনতেন বেশি। মাঝেমধ্যে যাত্রীরাও কিনতেন। বর্তমানে ঘাটে গাড়ি অপেক্ষমাণ থাকে না। উল্টো অনেক সময় দুই-তিনটি গাড়ি নিয়ে ফেরি ঘাট ছাড়ছে। এখন দিন-রাত মিলে দু-তিন হাজার টাকা বিক্রি হয় না। সেখানে ব্যবসাই বা হবে কী?
গতকাল বুধবার রাতে পাটুরিয়া ঘাট থেকে দৌলতদিয়া ঘাটের উদ্দেশে ছেড়ে আসা একটি রো রো (বড়) ফেরিতে গানে গানে লুঙ্গি বিক্রি করছিলেন আবদুর রশিদ। তাঁর গান শুনে মানুষজন জড়ো হচ্ছিলেন। তিনিও লুঙ্গি–গামছা দেখাচ্ছিলেন।
আবদুর রশিদের বাড়ি পাবনার নগরবাড়ি উপজেলার আমিনপুর থানার চর দাতিয়া গ্রামে। থাকেন পাটুরিয়া ঘাটের একটি মেসে। পরিবারে রয়েছে স্ত্রী, এক ছেলে আর এক মেয়ে।
চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন আবদুর রশিদ। এরপর অর্থের অভাবে পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায় তাঁর। এক যুগ ধরে এই ব্যবসা করছেন তিনি। যাত্রী ও ক্রেতাদের মনোযোগ আকর্ষণ ও আনন্দ দিতে গানের মধ্যে ভাঙা ভাঙা ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করেন ভ্রাম্যমাণ এই ব্যবসায়ী।
আবদুর রশিদ প্রথম আলোকে বলেন, এই ব্যবসা করেই তাঁর সংসার চলে। এখান থেকে আসা উপার্জন দিয়েই মেয়েকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত পড়িয়ে বিয়ে দিয়েছেন। ছেলে পাবনার একটি কলেজের স্নাতক শ্রেণিতে পড়াশুনা করছেন। ছেলের পড়াশোনার খরচও আসে এখান থেকে।
আগে প্রতি সপ্তাহে পাবনার নগরবাড়ি বা সুজানগর পাইকারী হাট থেকে লুঙ্গি-গামছা কিনে পাটুরিয়া ঘাটে চলে আসতেন আবদুর রশিদ।
তিনি বলেন, ‘কাপড় কিনতে গেলে বাড়িতে এক দিন থেকে আসতাম। এখন দুই সপ্তাহ পরও বাড়ি বা হাটে যাওয়ার প্রয়োজন হয় না। এখন যা রোজগার হয়, তাতে নিজের খরচ কোনোমতে চলে, সংসার আর চলে না। ঘাটের ভ্রাম্যমাণ সব ব্যবসায়ীরই একই অবস্থা।’