বাগেরহাটে চাকরি বহাল রাখার দাবিতে প্রশাসনিক ভবনে তালা দিয়ে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালের আউটসোর্সিং কর্মীরা। আজ বুধবার সকাল আটটা থেকে হাসপাতালের পুরোনো ভবনের দ্বিতীয় তলার প্রশাসনিক ভবনের ফটকে তাঁরা তালা লাগিয়ে করিডরে অবস্থান নেন। দীর্ঘদিন কর্মরত ৬৬ জনকে বাদ দিয়ে নতুন ৯৪ কর্মী নিয়োগ দেওয়ার প্রতিবাদে দিনব্যাপী এই কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন আউটসোর্সিং শ্রমিকেরা।
শ্রমিকদের দাবি, দুই বছর ধরে তাঁরা সরকারি সব নিয়মকানুন মেনে হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করছেন। কিন্তু নবনিযুক্ত ঠিকাদার ‘এইচ আর ডি অ্যান্ড ই এজেন্সি’ অজানা কারণে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন দক্ষ কর্মচারীদের বাদ দিয়ে নতুন কর্মচারী নিয়োগ দিয়েছে। চাকরি ফিরে পেতে ৬৬ কর্মচারী সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে রিটও করেছেন। চাকরিতে বহাল না করলে আরও কঠোর কর্মসূচি দেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন আউটসোর্সিং কর্মচারীরা।
আউটসোর্সিং কর্মচারী ঐক্য পরিষদের বাগেরহাট জেলা শাখার সভাপতি মো. আল আমিন বলেন, ‘আমাদের নিয়োগ দুই বছরের মতো হলেও এখানে এমন অনেকে আছেন, যাঁরা ১০ বছরের বেশি সময় ধরে হাসপাতালে সেবা দিচ্ছেন। অনেকে আরও বেশি সময় ধরে সেবা দিচ্ছেন। দীর্ঘদিন নামমাত্র বেতন, এমনকি বিনা বেতনে সেবা দিতে দিতে অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা অর্জন করেছেন। তাঁদের ওপর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও সেবাগ্রহীতারা খুশি। তারপরও আমাদের নিয়ে ষড়যন্ত্র চলছে। আমাদের চাওয়া একটাই, আমাদের চাকরি বহাল চাই।’
আউটসোর্সিং কর্মচারী আকলিমা বলেন, ‘২০ বছরের বেশি সময় ধরে হাসপাতালে সেবা দিচ্ছি। করোনা মহামারির সময়ও রোগীদের সেবা দিয়েছি, মৃতদের গোসল করিয়েছি। তখন তেমন বেতনও পেতাম না, বছর দুয়েক হলো আমরা আউটসোর্সিং কর্মচারী হিসেবে কাজ করি। মাসে সামান্য টাকা পাই, তাতে মোটামুটি সংসার চলত। এভাবে চাকরিটা চলে গেলে আমরা খাব কী।’
কার্জন শেখ নামের আরেক কর্মী বলেন, ‘আমরা প্রায় ছয় মাস ধরে বেতন পাই না। তার মধ্যে আমাদের কাজে আসতে নিষেধ করেছে। আমাদের অপরাধ কী? যদি আমাদের বাদ দেওয়ার কোনো যৌক্তিক কারণ থাকে, তাহলে সেটা বলুক, আমরা অপরাধী হলে চলে যাব। কিন্তু সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো অপরাধ ছাড়া আমাদের বাদ দিতে পারেন না। আমরা এ বিষয়ে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক, জেলা প্রশাসক ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর—সবার কাছে আবেদন করেছি। কোনো কাজ হয়নি। শেষ পর্যন্ত আমরা উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হয়েছি। আশা করি, আমরা ন্যায়বিচার পাব।’
আন্দোলনরত কর্মীদের অভিযোগ, সরকারি আউটসোর্সিং নীতিমালা লঙ্ঘন করে দীর্ঘদিন ধরে কর্মরত ৬৬ জনকে কোনো গ্রহণযোগ্য কারণ ছাড়াই বাদ দেওয়া হয়েছে। তাঁদের পরিবর্তে নতুন করে ৯৪ জনকে নিয়োগ দেওয়া হলেও পুরো নিয়োগের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করা হয়নি। নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের অনেকেই কোনো লিখিত বা মৌখিক (ভাইভা) পরীক্ষায় অংশ না নিয়েই চাকরি পেয়েছেন। অন্যদিকে যাঁরা নির্ধারিত নিয়োগের প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন, তাঁদের অনেকেরই নাম চূড়ান্ত তালিকায় নেই। এ ছাড়া ভাইভার জন্য আগে প্রকাশিত প্রার্থীদের তালিকার সঙ্গে বর্তমানে নিয়োগ পাওয়া ৯৪ জনের তালিকার কোনো মিল নেই।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ১৩ জুন ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট বাগেরহাট জেলা হাসপাতালে ৬৬ জন আউটসোর্সিং কর্মচারী যোগদান করেন। যোগদানের সময় তাঁদের কাজের মেয়াদ ছিল ২০২৭ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত। কিন্তু নবনিযুক্ত ঠিকাদারের চুক্তি অনুযায়ী, হাসপাতালে ৯৪ আউটসোর্সিং কর্মচারী নিয়োগ দেওয়ার কথা রয়েছে। ইতিমধ্যে নতুন কর্মচারীদের নিয়োগপত্র দিয়েছেন ঠিকাদার।
এদিকে বেলা ১১টার দিকে নতুন নিয়োগ পাওয়া কর্মচারীরা হাসপাতালে যোগদান করতে এলে অবস্থান কর্মসূচিতে থাকা পুরোনো কর্মচারীদের সঙ্গে হট্টগোল শুরু হয়। পরে সেখানে উপস্থিত হয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার সৌরভ কুমার মন্ডল ও হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক অসীম কুমার সমাদ্দার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।
এর আগে প্রায় এক মাস ধরে চাকরি বহাল রাখার দাবিতে মানববন্ধন, স্মারকলিপি প্রদান ও সংবাদ সম্মেলনের মতো কর্মসূচি পালন করেছেন আউটসোর্সিংয়ের কর্মচারীরা। সব শেষ আজ প্রশাসনিক ভবনে তালা দিয়ে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন তাঁরা। এর ফলে আউটডোরের সেবা কিছুটা ব্যাহত হয়েছে।
হাসপাতালে আউটসোর্সিং নিয়োগ নিয়ে এত সব ঘটনা ঘটলেও নবনিযুক্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এইচ আর ডি অ্যান্ড ই এজেন্সির স্বত্বাধিকারী মো. সাইদুর রহমান অথবা তাঁর কোনো প্রতিনিধিকে হাসপাতালে পাওয়া যায়নি। সাইদুর রহমানকে একাধিকবার ফোন করা হলেও রিসিভ করেননি তিনি।
২৫০ শয্যাবিশিষ্ট বাগেরহাট জেলা হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক অসীম কুমার সমাদ্দার বলেন, ‘পুরোনো কর্মচারীরা আদালতের শরণাপন্ন হয়েছেন। আদালত যে আদেশ দেবেন, আমরা তা বাস্তবায়ন করব। সবাইকে আপতত ধৈর্য ধারণ করতে বলা হয়েছে।’ সেবা ব্যাহত হওয়ার বিষয়ে অসীম কুমার সমাদ্দার বলেন, প্রশাসনিক ভবনে তালা দেওয়ায় আউটডোরে রোগীদের সেবায় কিছুটা জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। তবে সেটা বিকল্প পদ্ধতিতে চিকিৎসকের দায়িত্বপ্রাপ্ত ওয়ার্ডের কক্ষে বসে সেবা চালু রাখা হয়েছে।