কুমিল্লায় শিক্ষার্থীদের উচ্ছ্বাস, উৎসবমুখর পরিবেশে পরীক্ষা

ডাচ্-বাংলা ব্যাংক-প্রথম আলো গণিত উৎসবের কুমিল্লার আঞ্চলিক পর্বে পরীক্ষা হলে শিক্ষার্থীরা। শনিবার সকালে কুমিল্লা নগরের নবাব ফয়জুন্নেছা সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়েছবি: আবদুর রহমান

লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার খিলবাইছা উচ্চ বালিকা বিদ্যানিকেতনের দশম শ্রেণির আরওয়াইফফাত নাঈমা। ‘ডাচ্-বাংলা ব্যাংক-প্রথম আলো গণিত উৎসব ২০২৬’-এর কুমিল্লার আঞ্চলিক পর্বে অংশগ্রহণ করতে বাবা মো. মাহবুবুর রহমানের সঙ্গে ভোর পাঁচটায় রওনা দেয় সে। সিএনজি অটোরিকশা, বাস এবং পরে অটোতে করে সকাল সাড়ে আটটায় এসে পৌঁছায় কুমিল্লা নগরের নবাব ফয়জুন্নেছা সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে। এই দীর্ঘ পথচলায়ও নাঈমার ক্লান্তি নেই, বরং আনন্দে প্রথমবারের মতো গণিত উৎসবে অংশ নিয়ে উচ্ছ্বসিত সে।

শিক্ষার্থী নাঈমা বলল, ‘আমি ভীতি দূর করে গণিতকে জয় করতে চাই। এ জন্য আজকের গণিত অলিম্পিয়াডে এসেছি।’

নাঈমার মতো এক হাজারের বেশি খুদে গণিতবিদ শনিবার অংশ নিয়েছে ‘ডাচ্-বাংলা ব্যাংক-প্রথম আলো গণিত উৎসব ২০২৬’-এর কুমিল্লার আঞ্চলিক পর্ব। কুমিল্লা নগরের স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নবাব ফয়জুন্নেছা সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে এই গণিত উৎসব হয়েছে।

ডাচ্-বাংলা ব্যাংক-প্রথম আলো গণিত উৎসবের কুমিল্লার আঞ্চলিক পর্বের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিচ্ছেন জেলা প্রশাসক মু.রেজা হাসান
ছবি: প্রথম আলো

সকাল ১০টার দিকে নবাব ফয়জুন্নেছা সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠে সমবেত কণ্ঠে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে উৎসবের শুরু হয়। একই সঙ্গে উত্তোলন করা হয় জাতীয় পতাকা, বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াডের পতাকা ও আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডের পতাকা। পরে বেলুন উড়িয়ে ছড়িয়ে দেওয়া হয় গণিত উৎসবের বার্তা।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন কুমিল্লার জেলা প্রশাসক মু. রেজা হাসান। একই সঙ্গে বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াডের পতাকা উত্তোলন করেন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. আবুল বাশার ভূঁঞা এবং আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডের পতাকা উত্তোলন করেন ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের কুমিল্লা ঝাউতলা শাখার ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেন।

উদ্বোধনী পর্বে আরও উপস্থিত ছিলেন কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাতেমা তুজ জোহরা, কুমিল্লা জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ আবদুল হাফিজ, কুমিল্লা আইডিয়াল কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ মহিউদ্দিন লিটন। প্রথম আলোর কুমিল্লা প্রতিনিধি আবদুর রহমানের সঞ্চালনায় স্বাগত বক্তব্য দেন নবাব ফয়জুন্নেছা সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক সৈয়দা খোশনেআরা বেগম।
গণিত উৎসবের উদ্বোধন ঘোষণা করে জেলা প্রশাসক মু. রেজা হাসান বলেন, ‘এই প্রতিযোগিতার মাধ্যমে গণিতের ভয়কে জয় করবে শিক্ষার্থীরা। আমাদের আগামী দিনের যেই ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এখানে রয়েছে, তারাই গণিতকে জয় করবে। এই শিক্ষার্থীরাই একদিন পৃথিবী জয় করবে বলেও আমি বিশ্বাস করি। গণিত নিয়ে এমন আয়োজন সত্যিই অসাধারণ। এ জন্য ডাচ্-বাংলা ব্যাংক-প্রথম আলোসহ আয়োজকদের ধন্যবাদ জানাচ্ছি।’

কুমিল্লা অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজেদের সাফল্য দেখাবে উল্লেখ করে জেলা প্রশাসক বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, তোমরা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজেদের সাফল্য দেখাবে।’

গণিত উৎসবের কুমিল্লার আঞ্চলিক পর্বে পরীক্ষা হলে শিক্ষার্থীরা
ছবি: প্রথম আলো

‘গণিত শেখো, স্বপ্ন দেখো’ স্লোগানে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের পৃষ্ঠপোষকতায় ও প্রথম আলোর ব্যবস্থাপনায় ২৪তম বারের মতো এই গণিত উৎসবের আয়োজন করেছে বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটি। এ বছর দেশের ১২টি শহরে আঞ্চলিক গণিত উৎসব আয়োজিত হচ্ছে, যার মধ্যে একটি কুমিল্লা। আয়োজনে সহযোগিতা করে প্রথম আলো বন্ধুসভা, কুমিল্লার সদস্যরা। উদ্বোধনের পর সকাল ১০টা ৪০ মিনিট থেকে বিদ্যালয়ের চারটি ভবনের ১৫টি কক্ষে গণিতের পরীক্ষা শুরু হয়। আনন্দমুখর পরিবেশে এক ঘণ্টার পরীক্ষা শেষ করে শিক্ষার্থীরা। এই আঞ্চলিক উৎসবে কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁদপুর, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী ও ফেনী—এই ৬ জেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ১ হাজার ৮ জন শিক্ষার্থী অংশ নেয়। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাঁদের শিক্ষক ও অভিভাবকেরা আসেন এই গণিত উৎসবে।

গণিত উৎসবের কুমিল্লার আঞ্চলিক পর্বের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা
ছবি: প্রথম আলো

আয়োজকেরা জানান, পরীক্ষা শেষে উত্তরপত্র মূল্যায়ন হয়েছে। এ বছর ফলাফল ঘোষণা করা হবে অনলাইনে। কুমিল্লা আঞ্চলিক পর্বের বিজয়ীদের ফলাফল দ্রুত সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াডের ওয়েবসাইটে (matholympiad.org.bd) প্রকাশ করা হবে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের কুমিল্লা ঝাউতলা শাখার ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেন তাঁর বক্তব্যে গণিত উৎসবে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের সাফল্য কামনা করেন। তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের গণিতভীতি দূর করতে এই আয়োজনে পাশে আছে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক। আজকের এই শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিজেদের সাফল্য দেখাবে বলে আমি বিশ্বাস করি।’

সকাল ১০টায় উৎসব শুরু হওয়ার কথা থাকলেও ৮টার মধ্যেই বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ মুখর হয়ে ওঠে শিক্ষার্থীদের পদচারণে। অংশগ্রহণকারীদের সঙ্গে আসেন তাঁদের শিক্ষক ও অভিভাবকেরাও। অনেক শিক্ষার্থী অভিভাবকের সঙ্গে ভোরে রওনা দিয়ে নির্ধারিত সময়ের আগেই উৎসবস্থলে এলেও তাঁদের চোখে–মুখে সেই ক্লান্তির ছাপ দেখা যায়নি। সকলেই ছিলেন উচ্ছ্বসিত। গণিত উৎসবকে কেন্দ্র করে বিদ্যালয়ের আঙিনায় বসে প্রথমা, তাম্রলিপি, স্বপ্ন ৭১, তৌফিকসহ কয়েকটি প্রকাশনীর স্টল। প্রতিটি স্টলেই শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ভিড় দেখা গেছে। তাঁরা বই স্টলগুলো ঘুরে দেখেন। অনেকে নিজের পছন্দের বই কেনেন।

গণিত উৎসবের কুমিল্লার আঞ্চলিক পর্বের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। শনিবার সকালে কুমিল্লা নগরের নবাব ফয়জুন্নেছা সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে
ছবি: প্রথম আলো

ফেনী গার্লস ক্যাডেট কলেজের একাদশ শ্রেণির অনামিনা দেবনাথ এখন পর্যন্ত দুবার অংশ নিয়েছে গণিত উৎসবে। অনামিনা দেবনাথ বলেন, ‘গণিত আমার ভালো লাগে। এই প্রতিযোগিতায় ধারাবাহিক অংশগ্রহণের ফলে কোন গণিতভীতি কাজ করে না।’
নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার জমিদারহাট বেগম নুরুনাহার উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী মাহমুদা সিদ্দিকা এসেছে বাবা মহিউদ্দিনের সঙ্গে। মহিউদ্দিন বলেন, ‘মেয়েকে নিয়ে ভোরে রওনা দিয়ে এসেছি৷ এর আগে ফেনীতে অংশগ্রহণ করেছিল। এবার কুমিল্লা এসে খুবই উচ্ছ্বাসিত সে। অত্যন্ত সুশৃঙ্খল আয়োজন আমার কাছে ভালো লেগেছে।’

চলতি বছর গণিত অলিম্পিয়াডে অংশ নেওয়ার জন্য সারা দেশ থেকে অনলাইনে ৫১ হাজার ৫৩২ শিক্ষার্থী নিবন্ধন করেছে। নিবন্ধিত শিক্ষার্থীদের নিয়ে প্রথমে ‘অনলাইন বাছাই অলিম্পিয়াড’ অনুষ্ঠিত হয় এবং বাছাই অলিম্পিয়াডের বিজয়ীদের নিয়ে এখন দেশের ১২টি শহরে ‘আঞ্চলিক গণিত উৎসব’ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আঞ্চলিক গণিত উৎসবের বিজয়ীদের নিয়ে ঢাকার অনুষ্ঠিত হবে জাতীয় গণিত উৎসব ২০২৬। জাতীয় গণিত উৎসবের সেরাদের নিয়ে কয়েক ধাপে গণিত ক্যাম্প-কর্মশালার মাধ্যমে জুলাই মাসে চীনে অনুষ্ঠেয় ৬৭তম আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডের জন্য বাংলাদেশ দল নির্বাচন করা হবে।