দুই বিদ্রোহীতে বিএনপির ভোট তিন ভাগ হওয়ার শঙ্কা, সুবিধা নিতে চায় জামায়াত

নজরুল ইসলাম, ইসফা খায়রুল হক ও রেজাউল করিমছবি: সংগৃহীত

‘প্রার্থী থাকতি কথা ছিল দুইটে, হয়ে তো গেছে চারটে। এখন ভোট ভাগ হবি। তবে এখনো কোনো প্রার্থী ভোট চাইতি আসেনি।’

রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার বিহারিপাড়া গ্রামে জমিতে পেঁয়াজের চারা রোপণ করতে করতে কথাগুলো বলছিলেন মো. সাদেকুল ইসলাম। তিনি দিনমজুর হিসেবে অন্যের জমিতে কাজ করেন, যদিও তাঁর নিজের কিছু আবাদি জমি আছে।

একই জমিতে কাজ করা আরেক দিনমজুর মো. রিপন আলী বলেন, ‘ভোটের পর কেউ খোঁজ নিবি না। আমার তো ভাগ্যির পরিবর্তন তারা আনতি পাইরবে না। এখন প্রার্থী মোটামুটি চারটে আছে। কোনটেকে দিব, ঠিক করিনি।’

বিহারিপাড়া গ্রামটি রাজশাহী-৫ (পুঠিয়া–দুর্গাপুর) আসনের অন্তর্ভুক্ত। এই আসনে প্রার্থীর সংখ্যা বেশি হলেও অনেক প্রার্থী এখনো ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে পারেননি। এতে ভোটারদের বড় একটি অংশ এখনো সিদ্ধান্তহীন।

বিএনপির ভোট তিন ভাগের শঙ্কা

রাজশাহী-৫ আসনে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি (বিএসপি) মিলিয়ে মোট সাতজন প্রার্থী রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে তিনজন স্বতন্ত্র প্রার্থী। এই তিনজনের দুজনই বিএনপির ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী। দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে নির্বাচনে দাঁড়ানোয় তাঁদের ইতিমধ্যে বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিএনপির প্রার্থী বেশি হওয়ায় দলটির ভোটব্যাংক তিন ভাগে বিভক্ত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। এতে জামায়াতের প্রার্থী সুবিধা পেতে পারেন বলে মনে করছেন অনেকে। তবে গত ২৮ ডিসেম্বর হঠাৎ করে জামায়াত প্রার্থী বদল করায় নতুন প্রার্থীকে ভোটারদের দোরগোড়ায় যেতে হচ্ছে। এতে একধরনের জটিল সমীকরণ তৈরি হয়েছে আসনটিতে। এই আসনে জামায়াতের জেলা কমিটির সহকারী সেক্রেটারি নুরুজ্জামান লিটন প্রায় ১১ মাস ধরে নির্বাচনী গণসংযোগ ও প্রচার চালিয়েছেন। তাঁর পরিবর্তে নতুন প্রার্থী করা হয়েছে পুঠিয়া উপজেলা জামায়াতের আমির মনজুর রহমানকে।

জামায়াতের প্রার্থী মনজুর রহমান বলেন, ‘তাদের (বিএনপি) তিনজন প্রার্থী। ভোট বিভিন্ন জায়গায় ভাগ হবে। এতে আমাদের সুবিধা তো হবেই। আমাদের ভোট তো থাকবেই, পাশাপাশি তাদের ভোটের একটি অংশও পাব বলে আশা করি।’ জামায়াতের প্রার্থী পরিবর্তনের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের মাঠ গোছানো আছে। আগের প্রার্থীও আমাদের সঙ্গে প্রচারণায় আছেন।’

মাঠে সক্রিয় বিএনপির দুই বিদ্রোহী

রাজশাহী-৫ আসনে বিএনপির প্রার্থী নজরুল ইসলাম। তাঁর বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন পুঠিয়া উপজেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি ইসফা খায়রুল হক (ঘোড়া প্রতীক) ও যুক্তরাজ্য জিয়া পরিষদের সহসভাপতি রেজাউল করিম (ফুটবল প্রতীক)। তাঁদের সঙ্গে স্থানীয় কিছু নেতা-কর্মীও সক্রিয় রয়েছেন।

তবে বিএনপির প্রার্থী নজরুল ইসলাম দাবি করেন, ‘এই আসনের নেতা-কর্মী ও ভোটাররা আমার সঙ্গেই আছেন। তাঁরা ধানের শীষ দেখেই ভোট দেবেন। বিদ্রোহী প্রার্থীরা বিএনপির ভোট নিতে পারবেন না।’

বিদ্রোহী প্রার্থীর বাড়ির রাস্তা পর্যন্ত ধানের ছড়া

পুঠিয়ার বিড়ালদহ মাজারের পাশে ছোট একটি বাজার। বাজারের উত্তর দিকে কিছু দূর এগোলেই বিদ্রোহী প্রার্থী ইসফা খায়রুল হকের বাড়ি। বাজারের প্রায় সব দোকানে দড়ি দিয়ে ধানের ছড়া ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। রাস্তার দুই পাশেও টাঙানো রয়েছে ধানের ছড়া ও ব্যানার-ফেস্টুন।

এই এলাকায় ভোটাররা প্রকাশ্যে কার পক্ষে ভোট দেবেন, তা বলতে অনীহা প্রকাশ করেন। একাধিক ভোটারের ভাষ্য, ইসফা খায়রুল হকের বাড়ি হওয়ায় তিনি স্বাভাবিকভাবেই এখানে কিছু ভোট পাবেন। তবে প্রকাশ্যে সমর্থন খুব একটা দেখা যাচ্ছে না।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ভোটার বলেন, দোকানে দোকানে ধানের ছড়া লাগানো মানে বিদ্রোহী প্রার্থীকে খুব বেশি সুবিধা করতে দেওয়া হবে না। তবে শিমুলও কিছু ভোট পাবেন।

এ বিষয়ে ইসফা খায়রুল হকের বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি।

দুর্গাপুরে সক্রিয় যুক্তরাজ্যপ্রবাসী প্রার্থী

যুক্তরাজ্য জিয়া পরিষদের সহসভাপতি ও স্বতন্ত্র প্রার্থী রেজাউল করিম ফুটবল প্রতীক নিয়ে বিশেষভাবে সক্রিয় দুর্গাপুর উপজেলায়। দুই উপজেলায় তাঁর ব্যানার-ফেস্টুন চোখে পড়লেও দুর্গাপুরে উপস্থিতি বেশি। তাঁর বাড়ি এই উপজেলায়।

রেজাউল করিম প্রথম আলোকে বলেন, ‘এই আসনে পুঠিয়া ও দুর্গাপুর নিয়ে নির্বাচন। দুর্গাপুর থেকে এখনো কেউ সংসদ সদস্য হননি। ব্যক্তি ইমেজ নিয়ে মাঠে আছি। ১২ তারিখে তারেক রহমানকে এই আসন উপহার দিতে চাই।’

দুর্গাপুরে সবজিখেতে কাজ করছিলেন কয়েকজন। তাঁদের মধ্যে মো. আজাদ নামে এক তরুণ বলেন, এবার ভালো প্রার্থী নেই। সবাই গতানুগতিক প্রচার-প্রচারণা করছেন। ভালো লাগলে তিনি ভোটকেন্দ্রে যাবেন।

ভোটের দিন মিলবে সমীকরণ

রাজশাহী–৫ আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৫৩ হাজার ১৭৩ জন। নারী ভোটারই অর্ধেক। পুঠিয়ার শিবপুর বাজারে চায়ের দোকানে বসে টেলিভিশনে নির্বাচনের খবর দেখছিলেন কয়েকজন প্রবীণ ভোটার। তাঁদের মতে, প্রার্থী বেশি হওয়ায় ভোটারের উপস্থিতি বাড়তে পারে। তবে বিএনপির ভোট ভাগ হলে জামায়াতের প্রার্থী সুবিধা পাবেন।

ষাটোর্ধ্ব সোহরাব হোসেন বলেন, এবার সমীকরণ আলাদা। ধানের শীষের একক প্রার্থী হলে সহজে জিতত। এখন প্রার্থী তিনজন। জামায়াতের প্রার্থীও বদলেছে। ভোটের দিনই বোঝা যাবে, কী হয়।