ওড়না-পায়জামায় শ্বাসরোধে তিনজনকে হত্যা, আদালতে আসামির স্বীকারোক্তি

খুলনা নগরে নানি ও দুই নাতিকে হত্যা মামলার আসামি রফিকুল ইসলাম হাওলাদারকে গ্রেপ্তার করেছে র‍্যাবছবি: র‍্যাবের সৌজন্যে

খুলনা নগরের সোনাডাঙ্গা এলাকায় নানি ও দুই নাতিকে হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার শিশু দুটির সৎবাবা ট্রাকচালক রফিকুল ইসলাম (৩৮) আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। আজ শনিবার তাঁকে আদালতে হাজির করা হলে তিনি ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন। রফিকুল জানান, গলায় ওড়না পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে তিনজনকে হত্যা করেছেন তিনি।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও সোনাডাঙ্গা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) অনিমেষ মণ্ডল প্রথম আলোকে এ তথ্য নিশ্চিত করেন। তদন্ত কর্মকর্তা অনিমেষ মণ্ডল বলেন, মামলার তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে। এ পর্যন্ত তদন্তে রফিকুল ছাড়া অন্য কারও সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায়নি।

আসামির জবানবন্দির বরাতে তদন্ত কর্মকর্তা জানান, ঈদের দিন রাতে শাশুড়ি বেবী বেগমের সঙ্গে রফিকুলের বাগ্‌বিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে বেবী বেগম জামাতাকে বাড়ি থেকে বের করে দেন। পরদিন সকাল সাড়ে সাতটার দিকে রফিকুল আবার ওই বাড়িতে যান। তখন মূল ফটক ও ঘরের দরজা খোলা ছিল। ঘরে তাঁকে দেখে গালাগাল শুরু করেন বেবী বেগম। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে রফিকুল তাঁকে ধাক্কা দিয়ে ঘরের মেজেতে ফেলে দেন এবং গায়ের ওড়না দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন। ঘটনাটি শিশু শামীম দেখে ফেললে তাকেও একইভাবে হত্যা করা হয়। শামীমের চিৎকারে ঘুম থেকে জেগে ওঠা আরেক শিশু মুস্তাকিম ঘটনাটি দেখে ফেলায় ট্রাঙ্কের ওপর থাকা একটি পায়জামা দিয়ে শ্বাসরোধ করে তাকে হত্যা করেন রফিকুল।

হত্যার পর ঘরের একটি কক্ষে বেবী বেগমের মরদেহ খাটের নিচে, শামীমের মরদেহ ট্রাঙ্কের ওপর এবং মুস্তাকিমের মরদেহ একটি ওয়ার্ডরোবের ড্রয়ারে লুকিয়ে রাখেন রফিকুল। এরপর ওই কক্ষ ও ঘরের মূল দরজায় তালা দিয়ে দেন তিনি।

আরও পড়ুন

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সময় ফাতেমা বেগম ঘুমিয়ে ছিলেন। ঘুম থেকে উঠে তিনি দেখেন, বাইরে থেকে ঘরের দরজা বন্ধ। ভেতর থেকে কয়েকবার ধাক্কা দেওয়ার পর রফিকুল দরজা খুলে দেন। তিনি ফাতেমা বেগমকে জানান, তাঁর মা বেবী বেগম বাড়ি ছেড়ে চলে গেছেন। দুপুরে ওই বাড়িতে খাওয়াদাওয়া করেন রফিকুল। একপর্যায়ে ঘরের তালাবদ্ধ কক্ষ থেকে দুর্গন্ধ বের হতে শুরু করলে তালা কাটার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ সময় রফিকুল সেখান থেকে চলে যান। প্রথমে তিনি সোনাডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ডে অবস্থান নেন। পরে দৌলতপুর ও ফুলবাড়ী গেট এলাকায় কিছুক্ষণ অবস্থান করে রাতে বরিশালের উদ্দেশে খুলনা ত্যাগ করেন।

গত বৃহস্পতিবার রাতে বরিশাল নগরের কাশীপুর এলাকা থেকে রফিকুলকে গ্রেপ্তার করে র‍্যাব। গতকাল শুক্রবার সকালে রফিকুলকে সোনাডাঙ্গা থানায় হস্তান্তর করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদের শুরুতে তিনি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করলেও পরে দায় স্বীকার করেন এবং আদালতে জবানবন্দি দিতে সম্মত হন। আজ শনিবার দুপুরে তাঁকে আদালতে হাজির করা হলে তিনি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। পরে আদালতের নির্দেশে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়।

গত ৩০ মে খুলনা নগরের সোনাডাঙ্গা থানার তমিজউদ্দিন সড়কের দারুস আমান মহল্লার একটি ভাড়া বাসা থেকে বেবী বেগম (৫৫), তাঁর নাতি শামীম ব্যাপারী (১৩) ও মুস্তাকিমের (৪) লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনার পরের দিন নিহত দুই শিশুর বাবা মাসুম ব্যাপারী বাদী হয়ে সোনাডাঙ্গা থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় তিনি উল্লেখ করেন, দাম্পত্য কলহের জেরে প্রায় চার বছর আগে তাঁর প্রথম স্ত্রী ফাতেমা বেগমের সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদ হয়। পরে ফাতেমা বেগম ট্রাকচালক রফিকুল ইসলাম হাওলাদারকে বিয়ে করেন। তবে ফাতেমার মা বেবী বেগম ওই বিয়ে মেনে নেননি। এ নিয়ে তাঁদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল এবং বেবী বেগম রফিকুলকে বাসায় যেতেও নিষেধ করতেন।