সকাল সাড়ে ১০টায় কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে গিয়ে দেখা গেছে, টার্মিনালের ভেতরে কয়েক শ বাস পড়ে আছে। সড়কের ওপর কিছু গাড়িতে যাত্রী ওঠানো হচ্ছে। টার্মিনালের বিভিন্ন পরিবহনের কাউন্টারে যাত্রীদের চাপ অনেক, কিন্তু টিকিট বিক্রি হচ্ছে না বাসসংকটের অজুহাতে। যাত্রাবাড়ীর গৃহবধূ আসমা খাতুন (৪৮) বলেন, সকাল আটটা থেকে তিনি কাউন্টারে অপেক্ষা করে হানিফ এন্টারপ্রাইজ বাসের দুটি টিকিট পেয়েছেন। তাও ২০০ টাকা অতিরিক্ত দিয়ে। জ্বালানি তেলের দাম দ্বিগুণ বাড়ানোয় তাঁদেরও অতিরিক্ত টাকায় টিকিটি কিনতে হচ্ছে।

শহরের কলাতলী, সুগন্ধা, লাবণী ও কটেজ জোন এলাকায় ৫০টির বেশি টিকিট কাউন্টারে ভিড় জমিয়েছেন শত শত পর্যটক। তাঁদের কেউ ঢাকা, কেউ চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী ও কুমিল্লায় যেতে চান। কুমিল্লার চাকরিজীবী সাদ্দাম হোসেন (৪৫) বলেন, গত বুধবার রাতে স্ত্রী ও তিন সন্তান নিয়ে কক্সবাজার ভ্রমণে আসেন তিনি। আজ সকালে বাসে তাঁদের কুমিল্লা ফেরার কথা। কাল রোববার সকাল থেকে তাঁর কর্মস্থলে যোগদানের কথা। কিন্তু সকাল সাতটা থেকে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছেন, বাস নেই। টিকিটও মিলছে না। রাতের মধ্যে কুমিল্লা পৌঁছানো না গেলে সমস্যায় পড়তে হবে তাঁকে।

default-image

কক্সবাজার হোটেল–গেস্টহাউস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সেলিম নেওয়াজ বলেন, কক্সবাজারের হোটেল–মোটেলে অবস্থান করছেন ৩৫ হাজারের বেশি পর্যটক। এর মধ্যে অন্তত ১৫ হাজার পর্যটকের আজ সকাল থেকে গন্তব্যে ফিরে যাওয়ার কথা। কিন্তু বাস না থাকায় কয়েক হাজার পর্যটক ভোগান্তিতে পড়েছেন। কেউ কেউ তিন গুণ ভাড়ায় প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস ভাড়া নিয়ে চট্টগ্রামের পথে রওনা দিয়েছেন। যাঁদের সামর্থ্য নেই, তাঁরা কাউন্টারে বাসের অপেক্ষায় আছেন।

কলাতলী মেরিন ড্রাইভ হোটেল–রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান বলেন, হঠাৎ জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার ঘোষণায় পর্যটনশিল্পে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। ভ্রমণ সংক্ষিপ্ত করে করে অনেকে বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। পর্যটকের সংখ্যাও কমতে শুরু করেছে।

বাসের নতুন ভাড়া নির্ধারণের অপেক্ষা

বেলা দেড়টা পর্যন্ত শহরের অন্তত ৪০টি বাস কাউন্টারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কক্সবাজার-ঢাকা রুটে নন–এসি বাসের টিকিট ২০০ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার টাকা, এসি ইকোনমি ২০০ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ২০০ টাকা, কক্সবাজার-চট্টগ্রাম রুটে নন–এসি বাসের টিকিট ১০০ টাকা বাড়িয়ে ৪৫০ টাকা এবং এসি বাসের টিকিট ১০০ টাকা বাড়িয়ে ৬০০ টাকা করে আদায় হচ্ছে। কক্সবাজার-টেকনাফ রুটে ভাড়া ২০ টাকা বাড়িয়ে ১৮০ টাকা, কক্সবাজার-চকরিয়া, কক্সবাজার-পেকুয়া রুটে ২০ টাকা বাড়িয়ে ১০০ ও ১৫০ টাকা আদায় হচ্ছে। তবে অনেক বাস ছাড়ছেন না সরকার থেকে নতুন ভাড়া নির্ধারণের অপেক্ষায়।

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে সকালে শহরের কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে কিছু শ্রমিক অঘোষিতভাবে অবরোধ সৃষ্টি করেন।

শীতাতপনিয়ন্ত্রিত গ্রিনলাইন, সোহাগ, এনা, শ্যামলী, সেন্টমার্টিন, সেঁজুতি, লন্ডন ও জেদ্দা এক্সপ্রেস পরিবহনের বাস চলাচলও সীমিত হয়ে পড়েছে। গ্রিনলাইন পরিবহনের পরিচালক মাহবুবুর রহমান বলেন, সকাল থেকে তাঁদের কোনো বাস ঢাকায় ছাড়েনি। বেলা ১১টায় তাঁদের একটি বাস ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়েছে। সিটভাড়া আগের নির্ধারিত মূল্য দুই হাজার টাকাই আদায় হয়েছে। তবে রাত নয়টার দিকে কয়েকটি বাস ছাড়তে পারে। তখন ভাড়া বাড়ানো হবে কি না, তাঁরা সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছেন। আগে প্রতিদিন কক্সবাজার থেকে ঢাকায় যেত গ্রিনলাইনের অন্তত ১০টি বাস।

আন্তজেলা সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম বলেন, শহর থেকে কক্সবাজার-চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার-ঢাকা সড়কপথে দৈনিক চলাচল করে ৭ হাজারের বেশি যানবাহন। এর মধ্যে কক্সবাজার-ঢাকায় সরাসরি চলে ৪২০টির বেশি বাস। এর মধ্যে ৪০টির বেশি শীতাতপনিয়ন্ত্রিত। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে সকালে শহরের কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে কিছু শ্রমিক অঘোষিতভাবে অবরোধ সৃষ্টি করেছিলেন। তাঁরা সেটি তুলে নিয়েছেন। এখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও যানবাহনের চলাচল সীমিত হয়ে পড়েছে। এ সুযোগে কতিপয় বাসচালক ও তাঁদের সহকারীদের বিরুদ্ধে যাত্রীদের কাছ থেকে ২০ থেকে ২০০ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ আসছে। তদন্ত করা হচ্ছে। সরকার কর্তৃক ভাড়া নির্ধারণ না হওয়া পর্যন্ত যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় অযৌক্তিক।

ট্যুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. রেজাউল করিম বলেন, ‘জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোকে কেন্দ্র করে হঠাৎ সড়কে যানবাহনের চলাচল কমে গেছে। এতে পর্যটকসহ যাত্রীদের সাময়িক দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। আশা করছি, বিকেল নাগাদ এ সংকট দূর হবে। তবে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ পেলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

এদিকে শহরের বাস টার্মিনালের ক্যাপ্টেন কক্স, আশরাফ আলী অ্যান্ড কোং, প্রধান সড়কের ভোলাবুবুর পেট্রলপাম্পে নতুন মূল্যে জ্বালানি তেল বিক্রি হচ্ছে। শহরের বাইরে উখিয়া, টেকনাফ, চকরিয়া, রামু ও ঈদগাহ স্টেশনগুলোর পাম্পেও ডিজেল-কেরোসিনের দাম প্রতি লিটারে ৩৪ টাকা বাড়িয়ে ১১৪ টাকা, পেট্রল ৪৪ টাকা বাড়িয়ে ১৩০ টাকা এবং অকটেনে ৪৬ টাকা বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা আদায় হচ্ছে। যদিও এসব জ্বালানি তেল কয়েক দিন আগের মজুত করা।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন