‘রাতটা গাড়িতেই কাটালাম, এখনো গ্যাস পাইনি’
রাত কেটেছে গাড়ির ভেতরেই। খাবার খেয়েছেন পাশের একটি হোটেলে। ভোর হতেই আবার গ্যাসের লাইনে দাঁড়িয়েছেন। তবু আজ সোমবার সকাল সাড়ে ৯টা পর্যন্ত গ্যাস পাননি। চট্টগ্রাম নগরের আকবর শাহ এলাকার পাহাড়িকা সিএনজি ফিলিং স্টেশনের সামনে দাঁড়িয়ে এভাবেই নিজের দুর্ভোগের কথা বলছিলেন সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক মোহাম্মদ আবু তাহের।
আবু তাহের প্রথম আলোকে বলেন, ‘৫ ঘণ্টা ধরে লাইনে আছি। রাতটা গাড়িতেই কাটালাম, এখনো গ্যাস পাইনি। কখন গ্যাস পাব, জানি না। হোটেলে খেয়ে যে টাকা খরচ করছি, সেটাও উঠছে না। সংসার কীভাবে চলবে, বুঝতে পারছি না।’
আবু তাহের একা নন। ১৩ দিন ধরে চলা গ্যাস-সংকট গতকাল রোববার থেকে আরও তীব্র হয়েছে। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালকদের ওপর। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফিলিং স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকায় তাঁদের কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। আয় কমে গেছে। অনেকেই রাত কাটাচ্ছেন গাড়িতে। কেউ কেউ সড়কের পাশেই বিশ্রাম নিচ্ছেন। এতে সড়কে অটোরিকশা চলছে কম।
আজ সরেজমিনে নগরের সিটি গেট এলাকার মীর সিএনজি ফিলিং স্টেশন, আকবর শাহর পাহাড়িকা ফিলিং স্টেশন ও ষোলশহরের ফসিল ফিলিং স্টেশন ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। প্রতিটি স্টেশনের সামনে শত শত সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও অন্যান্য গ্যাসচালিত যানবাহনের দীর্ঘ সারি। কেউ গাড়িতে ঘুমাচ্ছিলেন। কেউ সড়কের পাশে বসে আড্ডা দিচ্ছিলেন।
সিটি গেট এলাকার মীর সিএনজি ফিলিং স্টেশনের সামনে কথা হয় অটোরিকশাচালক আবুল হোসেনের সঙ্গে। দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও গ্যাস পাননি তিনি। হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘ঘরেও গ্যাস নাই, ফিলিং স্টেশনেও গ্যাস নাই। মহাবিপদে পড়েছি।’
চালকেরা বলছেন, আগে যেখানে ২০ থেকে ৩০ মিনিটের মধ্যে গ্যাস নিয়ে রাস্তায় নামা যেত, এখন সেখানে অপেক্ষা করতে হচ্ছে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা। ফলে দিনের অধিকাংশ সময়ই চলে যাচ্ছে লাইনে দাঁড়িয়ে। অনেকেই নির্ধারিত জমা তুলতে পারছেন না। সংসারের খরচ চালানোও কঠিন হয়ে পড়েছে। সংকটের প্রভাব পড়ছে সাধারণ যাত্রীদের ওপরও। কোথাও কোথাও গ্যাসের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা ও কমে যাওয়া আয় পুষিয়ে নিতে চালকেরা বাড়তি ভাড়া চাইছেন।
চাহিদার তুলনায় ১৬ কোটি ঘনফুট কম গ্যাস
কর্ণফুলী গ্যাস বিতরণ কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল) সূত্র জানিয়েছে, গতকাল তারা মাত্র ১৯ কোটি ঘনফুট গ্যাস পেয়েছে। অথচ চাহিদা অন্তত ৩৫ কোটি ঘনফুট। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় প্রায় ১৬ কোটি ঘনফুট কম গ্যাস নিয়ে সরবরাহ চালাতে হচ্ছে।
কোম্পানির কর্মকর্তারা বলছেন, এত কম গ্যাস দিয়ে চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। তাই বিভিন্ন খাতে লোড ম্যানেজমেন্ট করতে হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে আবাসিক গ্রাহক, শিল্পকারখানা এবং সিএনজি ফিলিং স্টেশন—সবখানেই।
দেশে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রূপান্তর করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের জন্য কক্সবাজারের মহেশখালীতে দুটি ভাসমান টার্মিনাল রয়েছে। ২১ জুলাই একসিলারেট এনার্জি পরিচালিত একটি টার্মিনালে আগুন লাগার পর থেকে সেখানকার সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। এর পর থেকেই জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের চাপ কমে যায়। ফলে চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ধীরে ধীরে সংকট বাড়তে থাকে। এখন সেই সংকট আরও তীব্র হয়েছে। বাসাবাড়িতে রান্না বন্ধ থাকার পাশাপাশি সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতেও গ্যাসের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হচ্ছে। গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এই দুর্ভোগ অব্যাহত থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
পরিস্থিতি কবে স্বাভাবিক হবে—এমন প্রশ্নে তেল, গ্যাস ও খনিজসম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) চেয়ারম্যান মো. আবদুল মান্নান প্রথম আলোকে বলেন, বিশেষজ্ঞ দল টার্মিনালে কাজ করছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে টার্মিনালের মেরামতকাজ করে গ্যাস সরবরাহের চেষ্টা চালাচ্ছে তারা।