দুপুর গড়িয়ে প্রায় বিকেল তখন, এর মধ্যে জ্যৈষ্ঠের তপ্ত রোদ কমেনি। পঞ্চগড় শহরের ব্যস্ত সড়কে ছুটে চলছে সারি সারি ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক। এর মধ্যেই ধীরগতিতে পায়ে প্যাডেল ঘুরিয়ে রিকশা চালাচ্ছিলেন রফিকুল ইসলাম (৫৭)। প্রায় চার দশক ধরে রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করা মানুষটির জীবন যেন সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না।
গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে শহরের সিঅ্যান্ডবি মোড়ে রিকশা নিয়ে বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন রফিকুল। ব্যাটারিচালিত রিকশার দাপটে এখন আর আগের মতো আয় নেই। দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি বলেন, আগে ভালোই আয় হতো। এখন মানুষ দ্রুত যেতে চায়। ব্যাটারিচালিত রিকশা আসার পর প্যাডেলের রিকশায় উঠতে চায় না কেউ।
রফিকুল ইসলামের দাবি, সকাল ১০টার দিকে বের হয়েছেন, বিকেল পর্যন্ত মাত্র ২০০ টাকা আয় করেছেন। কোনো কোনো দিন সর্বোচ্চ আড়াই শ টাকা হয়। এ আয় দিয়ে সংসার চালানো খুব কষ্ট। হাতে টাকাও নেই যে ব্যাটারিচালিত রিকশা কিনবেন।
পঞ্চগড় সদর উপজেলার ধাক্কামারা ইউনিয়নের যতনপুকুরী-মরিচপাড়া এলাকার বাসিন্দা রফিকুল। সাড়ে ৩ শতাংশ ভিটেমাটিতে স্ত্রী দেবাই বেগমকে নিয়ে তাঁর বসবাস। তিন ছেলে ও দুই মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। তাঁরা আলাদা সংসার করেন। রফিকুল ও তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে থাকে দুই মেয়ের সন্তান—এক নাতি ও এক নাতনি। প্যাডেলের রিকশা চালিয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ায় দেবাই বেগমকেও দিনমজুরের কাজ করতে হয়।
রফিকুলের মতো পঞ্চগড় শহরে এখনো প্যাডেলচালিত রিকশার অন্তত ১২ জন চালক আছেন। শহরে চলাচলকারী সহস্রাধিক ব্যাটারিচালিত রিকশার ভিড়ে তাঁদের সবার অবস্থা প্রায় একই। বয়স বেড়েছে, যান্ত্রিকতার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কমেছে আয়। তারপরও জীবিকার তাগিদে প্রতিদিন রিকশা নিয়ে রাস্তায় নামতে হচ্ছে তাঁদের। অর্থাভাবে ব্যাটারিচালিত রিকশা কিনতে পারছেন না কেউই।
শহরের আরেক প্যাডেলচালিত রিকশাচালক মনসুর আলী (৬৫)। সদর উপজেলার কামাত কাজলদিঘী ইউনিয়নের চছপাড়া এলাকার বাসিন্দা তিনি। শহরের করতোয়া সেতুসংলগ্ন এলাকায় ক্লান্ত শরীরে রিকশার হ্যান্ডলে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। চোখেমুখে ক্লান্তি আর অনিশ্চয়তার ছাপ।
কথা প্রসঙ্গে মনসুর বলেন, ‘প্রায় ১৫ বছর গাজীপুরোত রিকশা চালাইছু, সেলা (তখন) ভালোয় আয় হইছিলো। সাত বছর আগোত (আগে) পঞ্চগড়ে আসে (এসে) রিকশা চালা শুরু কইচ্ছু। সেলা (তখন) এত ব্যাটারির রিকশা ছিলোনাই । ব্যাটারির তানে (জন্য) হামার রিকশাত কেহো উঠিবা চাহে না, এইতানে (এজন্য) সংসারও ঠিকমতো চলে না। যেলা (যখন) যাত্রী পাই না, সেলা (তখন) মানুষের বাজার বাড়িত দিয়ে আসি। এতে কিছু আয় হয়। হামরা (আমরা) দুই শ টাকা আয় করতে করতে ব্যাটারির রিকশা আট শ থেকে এক হাজার টাকা আয় করে।’
একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানালেন আরেক রিকশাচালক শাহজাহান আলী (৫০)। তিনি বলেন, এখন আগের মতো যাত্রী পাওয়া যায় না। প্যাডেলের রিকশা দেখলে মানুষ উঠতে চায় না। তাই একটি ওষুধের দোকানের মালামাল বহনের কাজ করেন। দোকানেও কিছু কাজ করে দেন।