মণ্ডপে সড়ক দুর্ঘটনার চিত্র, রক্তাক্ত ছেলে নিয়ে মায়ের আকুতি

চট্টগ্রামের পটিয়ায় দুর্গাপূজার মণ্ডপে সড়ক দুর্ঘটনার ভয়াবহতা ও এর ফলে একটি পরিবারের দুর্ভোগ তুলে ধরা হয়েছে। ‘পথেই জীবন’ নামের এই থিম দেখতে বিভিন্ন এলাকা থেকে আসছেন দর্শনার্থীরা।

সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সচেতনতার বিভিন্ন বার্তা নিয়ে সাজানো হয়েছে দুর্গাপূজার থিম। গত শুক্রবার চট্টগ্রামের পটিয়া থেকে তোলাছবি: প্রথম আলো

সড়কে পড়ে আছেন দুর্ঘটনায় আহত এক তরুণ। পাশে তাঁর মা দুই হাত তুলে প্রার্থনা করছেন দেবী দুর্গার কাছে। কোথাও অ্যাম্বুলেন্সে করে আহত ব্যক্তিকে নেওয়া হচ্ছে, কোথাও দুর্ঘটনার দৃশ্যের পাশে লেখা ‘ধীরে চলুন, জীবন মূল্যবান’। সড়ক দুর্ঘটনার এমন নানা চিত্র তুলে ধরা হয়েছে চট্টগ্রামের পটিয়ার একটি পূজামণ্ডপে।

পটিয়া পৌর এলাকার সুচক্রদণ্ডী জগন্নাথ ধাম মিলন মন্দিরে এর অবস্থান। পূজার এ থিমের নাম দেওয়া হয়েছে ‘পথেই জীবন’। সড়ক দুর্ঘটনার ভয়াবহতা তুলে ধরার পাশাপাশি নিরাপদে চলাচলের সচেতনতা তৈরির বার্তা দেওয়া হয়েছে এ আয়োজনে। ব্যতিক্রমী এ মণ্ডপ দেখতে চট্টগ্রাম নগরসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে দর্শনার্থীরা আসছেন।

মানুষ যেন এ আয়োজন থেকে শিক্ষা নেয় ও নিরাপদে চলাচলে সচেতন হয়, সেটিই আমাদের প্রত্যাশা।
নয়ন দে, প্রতিমাশিল্পী

গত শুক্রবার দুপুরে মন্দিরে গিয়ে দেখা যায়, প্রধান সড়কসংলগ্ন প্রবেশপথ থেকেই চোখে পড়ে দুর্গাপূজার ব্যতিক্রমী সাজসজ্জা। প্রবেশপথে দেবী দুর্গার বিশাল প্রতিমা তৈরি করা হয়েছে। দুই পাশে রয়েছে বিভিন্ন যানবাহন ও সড়ক দুর্ঘটনার চিত্র। বর্ণিল আলোকসজ্জাসহ কিছু কাজ তখনো চলছিল।

মণ্ডপের বিভিন্ন স্থানে রয়েছে ‘সামনে সরু রাস্তা’, ‘সচেতন হলে নিরাপদ ভবিষ্যৎ’ ও ‘ধীরে চলুন, জীবন মূল্যবান’ লেখা সাইনবোর্ড। কোথাও সড়কে দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিকে পড়ে থাকতে দেখা যায়। এর পাশেই আহাজারি চলছে। অন্য একটি দৃশ্যে আহত রোগীকে অ্যাম্বুলেন্সে করে নেওয়া হচ্ছে। চিকিৎসাসেবার চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে মণ্ডপে।

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক, পটিয়া বাইপাস সড়ক, চট্টগ্রাম নগরের চেরাগী পাহাড়ের মোড়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রেলস্টেশন ও নগরের সিটি গেট এলাকার বিভিন্ন দুর্ঘটনার চিত্রও স্থান পেয়েছে এই আয়োজনে। মণ্ডপে বিভিন্ন ভাস্কর্যের মাধ্যমে সড়কে অসচেতনতা ও বেপরোয়া গতির কারণে দুর্ঘটনা এবং এর ফলে একটি পরিবারে নেমে আসা দুর্ভোগ তুলে ধরা হয়েছে।

মণ্ডপের থিমের নাম দেওয়া হয়েছে ‘পথেই জীবন’। এতে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে সচেতনতামূলক বিভিন্ন চিত্র ও বার্তা। গত শুক্রবার চট্টগ্রামের পটিয়ায়
ছবি: প্রথম আলো

গত শুক্রবার মণ্ডপ দেখতে এসেছিলেন চট্টগ্রাম নগরের আগ্রাবাদ এলাকার জ্যেষ্ঠ ব্যাংক কর্মকর্তা অনর্জনা ভট্টাচার্য। স্বামী, মেয়ে, জামাতা ও নাতি-নাতনিদের নিয়ে প্রথমবারের মতো তাঁরা এই মণ্ডপ দেখতে আসেন। অনর্জনা ভট্টাচার্য বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই থিম দেখে তাঁরা মণ্ডপটি দেখতে এসেছেন। এখানে এসে থিম দেখে তিনি অভিভূত হয়েছেন। এতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ও শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে। সবকিছু দেখে তাঁদের ভালো লেগেছে।

জগন্নাথ ধাম মন্দির পূজা উদ্‌যাপন কমিটির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পটিয়ার আলমপুর গ্রামের প্রতিমাশিল্পী নয়ন দে এবারের মণ্ডপের নকশা ও সাজসজ্জার কাজ করেছেন। তাঁর সঙ্গে ১৫ জন কর্মী প্রায় দেড় মাস ধরে এ কাজে যুক্ত ছিলেন। এতে খরচ হয়েছে প্রায় ৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা।

প্রতিমাশিল্পী নয়ন দে বলেন, নিজের পরিকল্পনা ও ভাবনা অনুযায়ী মন্দির কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে তিনি এই থিম তৈরি করেছেন। কাঠ, বাঁশ, লোহাসহ বিভিন্ন উপকরণ ব্যবহার করে অ্যাম্বুলেন্স, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, গাড়ি ও মানুষের ভাস্কর্য তৈরি করা হয়েছে। কর্কশিটের ওপর অ্যাক্রিলিক রং ব্যবহার করে মণ্ডপের ভেতরে ও বাইরে ২০টির বেশি দুর্ঘটনার দৃশ্য ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তির চিকিৎসার দৃশ্য মণ্ডপের থিমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। গত শুক্রবার চট্টগ্রামের পটিয়ায়
ছবি: প্রথম আলো

নয়ন দে বলেন, ‘বাংলাদেশে সামান্য অসচেতনতার কারণে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনায় একটি প্রাণহানির পাশাপাশি একটি পরিবারের স্বপ্ন ও আনন্দও থেমে যায়। এ বিষয় তুলে ধরতেই থিমের নাম দেওয়া হয়েছে “পথেই জীবন”। মানুষ যেন এ আয়োজন থেকে শিক্ষা নেয় ও নিরাপদে চলাচলে সচেতন হয়, সেটিই আমাদের প্রত্যাশা।’

জগন্নাথ ধাম মন্দির পূজা উদ্‌যাপন কমিটির সাধারণ সম্পাদক পুলক দে বলেন, মন্দিরটিতে এবার ৭৩তম দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। প্রতিবছর দূরদূরান্ত থেকে পূজামণ্ডপ দেখতে দর্শনার্থীরা আসেন। দক্ষিণ চট্টগ্রামের অন্যতম বৃহৎ আয়োজন হয় এখানে। মহাষষ্ঠী থেকে পাঁচ দিনব্যাপী পূজার আয়োজনের মধ্যে মহাপ্রসাদ বিতরণ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ নানা কর্মসূচি রয়েছে।

পটিয়া উপজেলা ও পৌরসভা পূজা মনিটরিং কমিটির উপদেষ্টা শ্যামল দে বলেন, পটিয়া উপজেলার ১৭টি ইউনিয়ন ও পৌরসভায় এবার ২১০টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। পূজা সুন্দর, সুষ্ঠু ও আনন্দময় করতে সংসদ সদস্য এনামুল হকের নেতৃত্বে উপজেলা ও পৌরসভা পর্যায়ে ৩০ সদস্যের মনিটরিং কমিটি গঠন করা হয়েছে।